ঢাকা সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বিসিবির নির্বাচন প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে চিঠি
বিসিবির নির্বাচন প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবার রূপ নিয়েছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালসহ ঢাকার ক্লাব সংগঠকরা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কাছে তদন্ত দাবি করেছেন। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সাবেক জাতীয় দলের অধিনায়ক তামিম ইকবালসহ ঢাকার একাধিক ক্লাব সংগঠক জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) দ্বারস্থ হয়েছেন। গতকাল রোববার তারা ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন এবং বর্তমান বোর্ডের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

বিসিবির পুরো পরিচালনা পর্ষদই ভেঙে দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে কি না, তা জানতে চাইলে তামিম বলেন, ‘এটা সময় বলবে ভাই। ঠিক প্রক্রিয়ায় আবেদন করার দরকার, আমরা সেটাকে বেছে নিয়ে আবেদন করেছি।’ আবেদন সম্পর্কে বিসিবির সাবেক পরিচালক ফাহিম সিনহা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আবেদন করেছি স্বাধীন তদন্ত কমিটির জন্য, যেখানে এনএসসির একজন প্রতিনিধি থাকতে পারবেন।’ এখন কেন হঠাৎ তদন্তের আবেদন, তা জানতে চাইলে মোহামেডানের পরিচালক মাসুদুজ্জামান বলেন, ‘গণতন্ত্র ফিরে এসেছে ১৭ থেকে ১৮ বছর পর। এখন একটা গণতান্ত্রিক সরকার, আমরা মনে করি কথা বলার সঠিক সময় এটা। এই কারণেই আমরা এই আবেদনটা করেছি।’

তামিম ইকবালের দাবি, ঢাকার ৭৬টি ক্লাবের মধ্যে অন্তত ৫০টি ক্লাব মনে করে বিসিবির নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে। নির্বাচনের আগে থেকেই কাউন্সিলর মনোনয়ন, ক্লাব প্রতিনিধিত্ব এবং ডাকযোগে ভোটগ্রহণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এসব অভিযোগ তুলে ঢাকার ১৬টি ক্লাব নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেয় এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেয়।

নির্বাচন বয়কটের প্রভাব পড়ে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটেও। কয়েকটি ক্লাব ঘরোয়া প্রতিযোগিতা বর্জনের ঘোষণা দেয়। এর ফলে ঢাকা প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়। ২০ দলের লিগে আটটি ক্লাব অংশ না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত ১২ দল নিয়ে লিগ আয়োজন করতে হয়। অন্য ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলো নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

নির্বাচনের পর নতুন বোর্ডের অধীনে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগসহ কয়েকটি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলেও ক্লাব ক্রিকেটের অচলাবস্থা পুরোপুরি কাটেনি। ঢাকার প্রায় ৪৫টি ক্লাব বর্তমান বোর্ডের অধীনে ঘরোয়া ক্রিকেট বর্জনের অবস্থানে ছিল, যা দেশের ক্রিকেট ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি করে। নির্বাচনের আগে তামিম ইকবাল নিজেও বিসিবির পরিচালক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। দেশের ক্রিকেটে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। একটি আধুনিক এক্সিলেন্স সেন্টার গড়ে তোলা, স্কুল ক্রিকেটকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং বোর্ডের অর্থ আরও কার্যকরভাবে বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবহার করার পরিকল্পনার কথাও তিনি বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে উল্লেখ করেন। তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষের কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি সরে দাঁড়ান। তামিম ইকবাল বলেন, ‘প্রিমিয়ার লিগ যদি খেলা না হয় তাহলে কী হবে? এসব কিন্তু প্রশ্ন করতে হবে, এগুলো জানতে হবে, ওদের উত্তর দিতে হবে।’

‘এসব আলোচনার মধ্যে খেলা যে হচ্ছে না, এই জিনিসটা আমরা সবসময় ভুলে যাই। ক্রিকেট বোর্ডকে এই জিনিসটার উত্তর দিতে হবে যে খেলা কেন হচ্ছে না। হ্যাঁ, আপনি ১২টা টিম নিয়ে খেলছেন, ৮টা টিমে ১০০-১৫০টা প্লেয়ার, প্রথম বিভাগে আলাদাভাবে টুর্নামেন্ট করা হয়েছে; কিন্তু দ্বিতীয় বিভাগের করা হয়নি, তৃতীয় বিভাগেও হয়নি।’-যোগ করেন তিনি।

এরই মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন বিষয়টিকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ক্লাব সংগঠকদের আশা, নতুন সরকারের অধীনে বিসিবির নির্বাচন নিয়ে তদন্তের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বর্তমান বিসিবি বোর্ডের সভাপতি সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার আমিনুল ইসলাম বুলবুল। এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বোর্ডের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসে এবং দীর্ঘদিনের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনসহ কয়েকজন পরিচালক পদ হারান।

পরে অল্প সময়ের জন্য ফারুক আহমেদ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে বুলবুল সভাপতি হন এবং নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হয়। তবে সেই নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক এখনো পুরোপুরি থামেনি। ক্লাব সংগঠকদের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জেলা ও বিভাগে কাউন্সিলর মনোনয়নের ক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করা হয়েছে। বিষয়টি আদালতেও গড়ায় এবং একটি মামলা দায়ের হয়, যা বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মামলাটি পুনরায় সক্রিয় হলে বোর্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

৫১টি ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করে এনএসসি সচিবের কাছে অভিযোগপত্র জমা দেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও গুলশান ক্রিকেট ক্লাবের কাউন্সিলর তামিম ইকবাল। তার সঙ্গে ছিলেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন, মোহামেডান ক্লাবের ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদুজ্জামান, সাবেক বোর্ড পরিচালক ও সূর্যতরুণ ক্লাবের কাউন্সিলর ফাহিম সিনহা, ইন্দিরা রোড ক্রীড়া চক্রের কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম বাবু, বাংলাদেশ বয়েজের কাউন্সিলর জিয়াউর রহমান তপু, প্রগতি সেবা সংঘের কাউন্সিলর সাব্বির আহমেদ রুবেল এবং গোপীবাগ ফ্রেন্ডসের কাউন্সিলর শফিউল ইসলাম শফুসহ অন্যরা।

এদিকে গত কয়েক মাসে বিসিবির কর্মকাণ্ড নিয়েও সমালোচনা হয়েছে বিভিন্ন মহলে। বোর্ড পরিচালকদের বক্তব্য, ঘরোয়া ক্রিকেট পরিচালনা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি বোর্ডের ভেতর থেকেই দুর্নীতির অভিযোগ তোলার ঘটনাও সামনে এসেছে। বিসিবি নির্বাচন নিয়ে অভিযোগের পর দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এই অভিযোগের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং তদন্তের উদ্যোগ নেয় কি না, সেটিই দেখার অপেক্ষা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত