ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

টেস্ট ক্রিকেটে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ

টেস্ট ক্রিকেটে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ

টেস্ট ক্রিকেটে গত দুই দশকে বাংলাদেশের সঙ্গী শুধু হতাশা আর আক্ষেপের গল্প। ক্রিকেটে এই অভিজাত ফরম্যাটে লাল সবুজ দলের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল প্রতিপক্ষের ২০ উইকেট তুলে নিতে না পারা। ব্যাটসম্যানরা লড়াই করলেও ম্যাচ জয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতো না। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন বাংলাদেশের বোলাররা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, ম্যাচ জেতানোর সামর্থ্যও দেখাচ্ছেন। সেই পরিবর্তনের প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক টেস্ট পারফরম্যান্সে। বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত মনে করেন, দলের এই আত্মবিশ্বাসের মূল উৎস বোলাররাই। তার বিশ্বাস, বোলারদের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ড্রেসিংরুমে নতুন এক বিশ্বাস তৈরি করেছে, বাংলাদেশ এখন টেস্ট ম্যাচ জিততে পারে, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

আগে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ অনেক সময় ইনিংসের নির্দিষ্ট অংশে ভালো করলেও পুরো ম্যাচে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারত না। কিন্তু এখন পেস ও স্পিন-দুই বিভাগেই এসেছে শৃঙ্খলা ও পরিকল্পনা। নতুন বলে উইকেট নেওয়া থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় ধরে চাপ তৈরি করা। সবকিছুতেই উন্নতির ছাপ স্পষ্ট। ফলে প্রতিপক্ষকে অলআউট করার মানসিকতাও তৈরি হয়েছে দলের মধ্যে। এই পরিবর্তনের বড় প্রভাব পড়েছে ব্যাটসম্যানদের ওপরও। আগে ব্যাটসম্যানদের ওপর অতিরিক্ত রান করার চাপ থাকত, কারণ দল জানত বোলারদের জন্য বড় লক্ষ্য প্রয়োজন। এখন সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। ব্যাটসম্যানরা নিজেদের স্বাভাবিক খেলায় মনোযোগ দিতে পারছেন। কারণ তারা জানেন, মাঝারি সংগ্রহও বোলাররা রক্ষা করার সামর্থ্য রাখেন। শুধু জয় নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটে এসেছে নতুন মানসিকতা। মাঠে এখন দলকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও সংগঠিত দেখা যায়। বোলারদের আগ্রাসী মানসিকতা পুরো দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। শৃঙ্খলাবদ্ধ বোলিং, পরিকল্পিত ফিল্ডিং এবং ধৈর্যশীল ব্যাটিং, সব মিলিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ এখন ভিন্ন এক পরিচয় গড়ে তুলছে।

অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ড দুই বড় দলকে বাংলাদেশ নাস্তানাবুদ করেছে স্পিন স্বর্গ বানিয়ে। সেখানে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ খেলেছে স্পোর্টিং উইকেটে। সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংসে আগেভাগে ডিক্লেয়ার করে দেওয়া, পর্যাপ্ত পুঁজি নিয়ে লড়াইয়ের আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের। সব কিছুর কৃতিত্ব অধিনায়ক নাজমুল দিলেন বোলারদের, ‘পেস বোলাররা ভালো করছে, এটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য খুবই ইতিবাচক দিক। আমাদের স্পিনাররা তো সবসময়ই যেকোনো কন্ডিশনে ভালো করেছে, তাই তাদের ওপর বিশ্বাস সবসময় ছিল। এখন পেস বোলাররাও ধীরে ধীরে সেই দায়িত্বটা নিতে শুরু করেছে, যা দলের জন্য বড় স্বস্তির বিষয়। আমি মনে করি, ক্রিকেট বোর্ডের উচিত পেস বোলারদের আরও ভালোভাবে মেইনটেইন করা এবং তাদের যত্নে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া। কীভাবে তাদের ফিটনেস, ওয়ার্কলোড ও প্রস্তুতি আরও ভালোভাবে সামলানো যায়, সেদিকে নজর রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

নাহিদ বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটের চতুর্থ ইনিংসে ৫ উইকেট পেয়েছেন। ম?্যাচে ৬ উইকেট নিয়েছেন তিনি। তাসকিন দীর্ঘদিন পর ফিরে সাদা পোশাকে নিজের ছন্দ বেশ ভালোভাবে দেখিয়েছেন। মিরাজ প্রথম ইনিংসে পেয়েছেন ৫ উইকেট। তাইজুল মিটিয়েছেন পরিস্থিতির দাবি। পেয়েছেন উইকেট। ইবাদত একেবারে আড়ালেও থাকেননি।

সব মিলিয়ে একাদশে থাকা ৫ বোলারই অধিনায়ককে সন্তুষ্ট করতে পেরেছেন বেশ, ‘এই সিদ্ধান্ত (ইনিংস ডিক্লেয়ার) নেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল আমাদের বোলিং আক্রমণের ওপর বিশ্বাস। এই ম্যাচে যে পাঁচজন বোলার খেলেছে, সবাই দক্ষ এবং সবাই ভালো বোলিং করেছে। দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজ যেভাবে শুরুটা এনে দিয়েছে, এরপর তাসকিন যেভাবে প্রথম উইকেট তুলে নিয়ে মোমেন্টাম তৈরি করেছে, সেটাই ম্যাচের গতি বদলে দেয়। পরে তাইজুল ভাই মধ্যের ওভারগুলোতে দারুণ বোলিং করেছে। প্রথম ইনিংসে হয়তো সে অতটা সুযোগ পায়নি, কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে নিজের অভিজ্ঞতার প্রমাণ দিয়েছে। আমার মনে হয়, চার-পাঁচজন বোলারই এই জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। বিশেষ করে তাসকিন ও নাহিদ রানার স্পেল ছিল অসাধারণ।’

স্পিনারদের কথা তুলে ধরে নাজমুল বলেছেন, ‘স্পিনারদের অবশ্যই কৃতিত্ব দিতে হবে। কারণ স্পিনাররা শুধু উইকেটই নেয় না, তারা এক প্রান্ত ধরে রেখে চাপও তৈরি করে। অনেক সময় দেখা যায়, স্পিনাররা ধারাবাহিকভাবে চাপ তৈরি করার পর হঠাৎ করে একজন পেস বোলার এসে ম্যাচের মোমেন্টাম বদলে দেয়। তাই আমি বলব, এই সাফল্যের পেছনে স্পিনারদের বড় অবদান আছে। বিশেষ করে পুরো টেস্ট জুড়ে মিরাজ যেভাবে বোলিং করেছে, সেটা অসাধারণ ছিল। স্পিনারদের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় খেলার পর যখন হঠাৎ করে একজন দ্রুতগতির পেসার আক্রমণে আসে, তখন ব্যাটসম্যানদের জন্য সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ম্যাচের ওই মুহূর্তগুলো বুঝতে পারা এবং সেই অনুযায়ী পরিবেশ তৈরি করাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় মাথায় রেখেই আমি রানাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করি।’ মিরপুরেও পেসাররা পঞ্চম দিনে আলো ছড়াচ্ছেন তা বেশ ভালোভাবেই মনে ধরেছে নাজমুলের, ‘গত কয়েকদিন ধরে মিরপুরের উইকেট বেশ ভালোই ছিল। আমরা যে ওয়ানডে সিরিজগুলো খেলেছি, সেখানেও উইকেটে ভালো পেস ও বাউন্স দেখা গেছে। তাই টেস্টেও এমন উইকেট পাওয়ার প্রত্যাশা আমাদের ছিল। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, পঞ্চম দিনে এসে রানা ও তাসকিন ভাই উইকেট পেয়েছে। সাধারণত টেস্টের পঞ্চম দিনে স্পিনাররাই বেশি প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে মিরপুরে যেখানে শেষ দিনে খেলা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু এবার ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। পেসাররা শেষ দিনেও কার্যকর বোলিং করে উইকেট নিতে পেরেছে, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন ও ইতিবাচক দিক।’ যারা নিয়মিত টেস্ট খেলছে তাদের বোর্ডের আলাদাভাবে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীতা অনুভব করছেন নাজমুল, ‘একই সঙ্গে যারা মূলত টেস্ট ক্রিকেট খেলে, তাদেরও আরও বেশি সুযোগ ও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ টেস্ট দলের ক্রিকেটাররাও এই দলের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাধারণত আমরা ওয়ানডে ক্রিকেট নিয়ে অনেক আলোচনা করি। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সেটা বেশি দেখা যায়। কিন্তু টেস্ট ম্যাচ শেষ হওয়ার পর অনেক সময় সেই আলোচনা আর থাকে না। এই জায়গা থেকে আমি মনে করি, গণমাধ্যম ও ক্রিকেট বোর্ড- দুই পক্ষেরই দায়িত্ব আছে টেস্ট ক্রিকেট এবং টেস্ট ক্রিকেটারদের আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার। কারণ এই সংস্করণেই একটি দলের প্রকৃত সামর্থ্য ও মানসিক দৃঢ়তা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা হয়।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত