
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বর্তমানে বাংলাদেশের পেস আক্রমণে নেতৃত্ব দেন তাসকিন আহমেদ ও নাহিদ রানা। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা নিশ্চিত করতে এই দুই তারকাকে দলে ভিড়িয়ে শক্তি বাড়িয়েছে মোহামেডান। গতকাল মঙ্গলবার লেজেন্ডেস অব রূপগঞ্জের বিপক্ষে ছিল তাদের প্রথম পরীক্ষ। দর্শকদের নজর ছিল সেদিকে। তাই মাঠে বসে খেলা দেখছিলেন গুটিকয় সমর্থক। তাড়া বেশ নড়েচড়ে বসলেন, দারুণ উপভোগ করতেও শুরু করলেন খেলা। ২২ গজে যে তখন তাণ্ডব শুরু করেছেন হাবিবুর রহমান সোহান! তাসকিন আহমেদের এক ওভারে নিলেন তিনি ২০ রান, নাহিদ রানার এক ওভারে ২৬! চোখের পলকে যেন পৌঁছে গেলেন তিনি রেকর্ডের ঠিকানায়। লেজেন্ডেস অব রূপগঞ্জের হয়ে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের বিপক্ষে ১৫ বলে ফিফটি করেছেন সোহান। স্পর্শ করেছেন লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড। এই রেকর্ড এতদিন এককভাবে ছিল পারভেজ হোসেন ইমনের।
মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ৩৪০ রান তাড়ায় রূপগঞ্জের ইনিংস শুরু করতে নামে সোহান। প্রথম তিন বলে কোনো রান তিনি করতে পারেননি। এরপরই চড়াও হন তাসকিন আহমেদের ওপর। অভিজ্ঞ পেসারের টানা চার বলে মারেন ছক্কা, চার, চার ও ছক্কা। পঞ্চম ওভারে আক্রমণে আনা হয় নাহিদ রানাকে। বাংলাদেশের ইতিহাসের দ্রুততম বোলার, এই সময়ে বিশ্ব ক্রিকেটের আলোচিত নাম। কিন্তু তাকে পাত্তাই দিলেন ভয়ডরহীন সোহান। এক্সট্রা কাভার দিয়ে বাউন্ডারিতে নাহিদকে বোলিংয়ে স্বাগত জানান সোহান। একটুর জন্য ছক্কা হয়নি সেই শটে। পরের বলে টাইমিং হলো আরও নিখুঁত। সেই এক্সট্রা কাভার দিয়েই এবার ছক্কা!
তেজি ফাস্ট বোলারের জবাবটা যেমন হওয়া উচিত, নাহিদ দেখালেন তেমনই। পরের বলটি শরীর তাক করা বাউন্সার। নিচু হয়ে ছেড়ে দিলেন সোহান। এরপর তিনিও দিলেন পাল্টা জবাব। জায়গা বানিয়ে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে লং অফের ওপর দিয়ে মারলেন ছক্কা। পরের বলে বল গ্যালারিতে পাঠালেন এক পা তুলে চোখধাঁধানো শটে এক পুল শটে। ওভারের শেষ বলে টাইমিং ঠিকমতো না হলেও আরেকটি চার লং অফ দিয়ে। ১৩ বলে তার রান তখন ৪৬। দ্রুততম ফিফটির রেকর্ডটি এককভাবে নিজের করে নেওয়া হাতছানি তার সামনে। কিন্তু পরের ওভারে স্ট্রাইক পেলেন না। এরপর মোহাম্মাদ সাইফ উদ্দিনের বলে নিতে পারলেন কেবল সিঙ্গল। শেষ পর্যন্ত রেকর্ডটি হলো পরের ওভারে। যদিও তাইজুল ইসলামের বলটি তিনি বুঝতে পারেননি ঠিকঠাক। কিন্তু ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপকে ফাঁকি দিয়ে বল চলে যায় বাউন্ডারিতে। ১৫ বলের ফিফটিতে তার নাম লেখা হয় পারভেজের পাশে। পারভেজের ইনিংসটি ছিল গত ঢাকা লিগে আবাহনী লিমিটেডের হয়ে শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের বিপক্ষে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দ্বিতীয় দ্রুততম ফিফটি ফরহাদ রেজার। প্রিমিয়ার লিগেই ২০১৯ সালে প্রাইম দোলেশ্বর স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের বিপক্ষে ১৮ বলে ফিফটি করেছিলেন অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার। ১৯ বলে ফিফটি করে তিনে আছেন নাজমুল হোসেন। ২০০৭ সালে জাতীয় লিগের একদিনের ম্যাচের আসরে ঢাকা বিভাগের হয়ে খুলনা বিভাগের বিপক্ষে ইনিংসটি খেলেছিলেন তিনি।
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে দ্রুততম ফিফটির বিশ্বরেকর্ডটির বয়স হয়ে গেছে ২০ বছরের বেশি। ২০০৫ সালে নভেম্বরে শ্রীলঙ্কার প্রিমিয়ার লিমিটেড ওভার টুর্নামেন্টে ১২ বলে ফিফটি করেছিলেন কৌশল্য উইরারাত্নে। রাঙ্গামা ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে সেদিন কুরুনেগালা ইয়ুথ ক্রিকেট ক্লাবের বিপক্ষে ৮ ছক্কায় ১৮ বলে ৬৬ করেছিলেন তিনি। বিশ্বরেকর্ডে সোহান ও পারভেজ যৌথভাবে আছেন চারে। সোহানের এই কীর্তি খুব বিস্ময়কর নয়। বরং বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন টর্নের্ডো ব্যাটিংয়ের জন্যই তিনি পরিচিত। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে বাংলাদেশের দ্রুততম শতরানের রেকর্ড তার, টি-টোয়েন্টিতে দেশের দ্রুততম শতক ও অর্ধশতকের কীর্তিও তারই।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের একদিনের ম্যাচের আসরে ৪৯ বলে সেঞ্চুরি করে তিনি ভেঙেছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজার (৫০ বল) রেকর্ড।
টি-টোয়েন্টির রেকর্ড দুটি গড়েন তিনি গত বছর রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপে। হংকংয়ের বিপক্ষে দোহায় বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়ে ফিফটি করেন তিনি ১৪ বলে, সেঞ্চুরি ৩৫ বলে। শুধু টি-টোয়েন্টিতে নয়, স্বীকৃত ক্রিকেটেই রেকর্ড এই দুটি। এবার রেকর্ডের এই ইনিংসটিতে অবশ্য ফিফটির পর খুব বেশি সুবিধা করতে পারেননি সোহান। তাইবুর রহমানের বাঁহাতি স্পিনে এলবিডব্লিউ হয়ে গেছেন ২৭ বলে ৫৯ রান করে। এই ম্যাচের আগে এবারের লিগে খুব ভালো করতে পারছিলেন না ২৬ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান। সাত ম্যাচে ফিফটি ছিল একটি। ঈদের বিরতির পর অবশেষে ফর্মে ফেরার আভাস দিলেন।
দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড গড়েও লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জকে জয়ের বন্দরে ভেড়াতে পারেননি হাবিবুর রহমান সোহান। তার বিদায়ের পর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে দলটির ব্যাটিং লাইন আপ।
এতে করে একেপেশে ম্যাচে সহজ জয় পায় মোহামেডান। রান তাড়ায় শুরুতেই আশিকুর রহমান শিবলীকে হারায় রূপগঞ্জ। এরপর ব্যাট হাতে ঝড় বইয়ে দেন হাবিবুর রহমান সোহান। পঞ্চম ওভারে নাহিদ রানাকে হাঁকান ৩ ছক্কা ও ২ চার। ১৫ বলে যৌথভাবে দ্রুততম ফিফটি করা সোহান ফেরেন ২৭ বলে ৫৯ রান করে। এরপর আচমকাই ভেঙে পড়ে রূপগঞ্জের ব্যাটিং লাইনআপ।
৬৮ রানে ১ উইকেট থেকে ১২০ রানের মধ্যে ৫ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকেই যায় তারা। এরপর নাসুম আহমেদ ও শেখ মেহেদী লড়াই করলেও সেটা শুধু ব্যবধান কমিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ১৬ ওভার বাকি থাকতেই গুটিয়ে যায় রূপগঞ্জ। মেহেদী ৩৭ আর নাসুম করেম ৪৫ রান।