
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে রাস্তায় গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব। এবার এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন নাঈমের সতীর্থ মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস ও তাসকিন আহমেদরাও। সভাপতি তামিম ইকবাল বলেছেন, ক্রিকেটার নাঈম হাসানের সঙ্গে গত শুক্রবার রাতে যা হয়েছে, কোনোভাবেই তা গ্রহণযোগ্য নয়। গতকাল শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজে এক পোস্টে এ মন্তব করেন তিনি।
জাতীয় দলের সাবেক এ অধিনায়ক লেখেন, নাঈম হাসানের সঙ্গে গত রাতে যা হয়েছে, কোনোভাবেই তা গ্রহণযোগ্য নয়। রাতে নাঈম আমাকে ফোন করার পর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে যা যা করা দরকার, করার চেষ্টা করেছি আমি ও অন্য বোর্ড পরিচালকরা। সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় আমরা কথা বলছি, নাঈম ও তার পরিবারের সঙ্গেও নিবিড় যোগাযোগ রাখছি। তামিম আরও লেখেন, বিসিবির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে গককাল সকালেই। এরপর আরও যা যা করণীয় আছে, সবকিছু করব আমরা। নাঈম ও সব ক্রিকেটারের পাশে আমরা আছি সবসময়। চট্টগ্রামে ডিবি পরিচয়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর ও হেনস্তার ঘটনায় প্রতিবাদে সরব হয়েছেন ক্রিকেটাররা। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের বিচার দাবী করেছেন তারা। প্রতিবাদ জানিয়েছে ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবও। গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে বিসিবি।
ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের শেষ রাউন্ডের ম্যাচ খেলে শুক্রবার নিজ শহর চট্টগ্রামে ফিরে এই ঘটনার শিকার হন নাঈম। বাংলাদেশ টেস্ট দলের নিয়মিত সদস্য এই অফ স্পিনার রাতে সংবাকর্মীদের জানান, রাত ৯টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটে চট্টগ্রামে যাওয়ার কথা ছিল তার। তবে ফ্লাইট দেরি হওয়ায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে তিনি চট্টগ্রাম পৌছান। এরপর বিমানবন্দর থেকে অটোরিকশায় বাসার পথে রওনা দেন। অটোরিকশাটি এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার পর লালখান বাজার এলাকায় একজন পুলিশ সদস্য থামার সংকেত দেন।
গাড়ি থামতেই ডিবি পুলিশ পরিচয়ে চালকের কাছ থেকে গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর নাঈমকে গাড়ি থেকে নামিয়ে গলায় ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তখন তিনি নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দেন, পরিচয়পত্রও দেখান। তবু তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। পুলিশের সঙ্গে সাদা পোশাকে থাকা এক ব্যক্তিও হাতে থাকা পাইপ দিয়ে তাকে পেটান। নাঈম জানান, ১০০ থেকে ২০০ মানুষ জড়ো হয়ে তার পরিচয় দিলেও পুলিশ মারধর থামায়নি, তারা বলছিল- তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না।’ এক পর্যায়ে অটোরিকশায় তুলে তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন ২৬ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। পরে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং ওসির কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানেও হেনস্তা করা হয়েছে বলে জানান নাঈম।
ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর তোলপাড় পড়ে যায় ক্রিকেট আঙিনায়। সামাজিক মাধ্যমেও তুমুল আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিসিবি গতকাল শনিবার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানায়। ‘শুক্রবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্য কর্তৃক বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে হয়রানি ও হেনস্থার ঘটনায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তার প্রতি এই অগ্রহণযোগ্য ও অনুপযুক্ত আচরণের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে বোর্ড এবং বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। একজন জাতীয় ক্রীড়াবিদের প্রতি এমন আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই ঘটনার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রত্যাশা করছে বিসিবি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানাচ্ছে।’
নাঈম থানায় সংবাদকর্মীদের জানান, বিসিবি প্রধান তামিম ইকবালকে ফোনে জানানোর পর তিনি বিসিবি পরিচালক ইসরাফিল খসরুকে (অর্থমন্ত্রী আমির মাহমুদ খসরুর ছেলে) ঘটনা জানান। এরপর তারা থানায় কথা বলেন। বিসিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও জানানো হয়, নাঈমের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বোর্ড। ‘বিষয়টি জানার পর থেকে, নাঈম হাসান ও তার পরিবারের মঙ্গল নিশ্চিত করতে এবং সমস্ত প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য তাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছে বিসিবি। এই গুরুতর বিষয়টির যথাযথ সমাধানে চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে বোর্ড। ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তার সব খেলোয়াড়ের কল্যাণ, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকবে।’
‘ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ওপর পুলিশের শারীরিক নির্যাতন ও হয়রানির তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব)। আমরা চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কর্তৃপক্ষকে নাঈম হাসানের ওপর শারীরিক নির্যাতনে জড়িত প্রত্যেক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। দেশের যেকোনো নাগরিকের জন্য এমন ঘটনা অগ্রহণযোগ্য। কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন এরইমধ্যে নাঈমের সঙ্গে কথা বলেছে, এবং তাকে জানিয়েছে যে দেশের সব ক্রিকেটার তার সঙ্গে আছে।’ বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক লিটন কুমার দাস সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘মাথা উঁচু রাখো, নাঈম। তুমি অসাধারণ একজন মানুষ।’
এই ঘটনার তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেছেন সিনিয়র এই ক্রিকেটার। ‘নাঈম হাসানের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তাকে এমন দুর্ভোগের মধ্যে দিয়ে যেতে দেখাটা হৃদয়বিদারক। একজন সহকর্মী ও সতীর্থ হিসেবে এই ঘটনায় আমি সত্যিই মর্মাহত। এই দেশের কোনো নাগরিকই এমন আচরণের যোগ্য নয়, বিশেষ করে একজন জাতীয় ক্রিকেটার তো নয়ই, যিনি গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
সুষ্ঠু ও যথাযথ তদন্তের এবং যত দ্রুত সম্ভব ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আশা করছি।’
নাঈমের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম। ‘নাঈমের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’ ‘যা ঘটেছে, তা আমাকে ব্যথিত ও লজ্জিত করেছে। একজন নাগরিক হিসেবে, একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। নাঈম, আমরা তোমার পাশে আছি।’ ওয়ানডে অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। ‘জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানের সঙ্গে চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ অত্যন্ত নিন্দনীয়, দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক। একজন জাতীয় খেলোয়াড়ের সঙ্গে এমন আচরণ দেশের ক্রীড়াঙ্গনের মর্যাদার ওপর আঘাত। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’
একইরকম দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন তাসকিন আহমেদ, তাইজুল ইসলামসহ আরও অনেক ক্রিকেটার। বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট অভিষেকে সবচেয়ে কম বয়সে ৫ উইকেট নেওয়ার রেকর্ডটি নাঈমের। ১৪ টেস্ট খেলে উইকেট নিয়েছেন তিনি ৪৮টি। চার দফায় পেয়েছেন ইনিংসে ৫ উইকেট। কদিন পরই বাংলাদেশ টেস্ট দলের হয়ে জিম্বাবুয়ে সফরে যাওয়ার কথা তার।
এদিকে নাঈম হাসানের সঙ্গে ঘটা এই ঘটনার অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের ঘোষণা দিয়েছে বিসিবি। এ নিয়ে কথা বলেছেন বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালসহ আরও কয়েকজন বোর্ড পরিচালক। এবার নাঈমের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাচ্ছেন বিসিবির মেডিকেল টিমের দুই সদস্য, যার মধ্যে একজন ডাক্তার এবং একজন ফিজিও রয়েছেন। সেখানে পৌঁছে তারা নাঈমের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেবেন এবং পর্যবেক্ষণ করবেন। যেহেতু সামনে টেস্ট সিরিজ রয়েছে। এর আগে গতকাল শনিবার সকালে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিসিবি জানায়, ‘নাঈম হাসানকে হয়রানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে বিসিবির। একইসঙ্গে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি বোর্ডের। শুক্রবার রাতে চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের হাতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানের হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।’
বিসিবি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ‘একজন জাতীয় ক্রিকেটারের সঙ্গে এমন অগ্রহণযোগ্য ও অনুপযুক্ত আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক। বোর্ড বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং মনে করে, এ ধরনের ঘটনার দ্রুত ও যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বোর্ড আশা করছে, ঘটনাটির নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ ‘ঘটনাটি জানার পর থেকেই বোর্ড নাঈম ও তার পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে ও তাদের খোঁজখবর নিচ্ছে। একইসঙ্গে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে। বিষয়টির সুষ্ঠু সমাধানে চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের সঙ্গেও বোর্ড নিবিড়ভাবে কাজ করছে বোর্ড।’
বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, তাদের সব ক্রিকেটারের কল্যাণ, মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর এবং এই ঘটনার অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।’