ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বিশ্বকাপে রূপকথা লিখল কেপ ভার্দে

বিশ্বকাপে রূপকথা লিখল কেপ ভার্দে

বিশ্বকাপ মানেই অঘটনের গল্প, আর ২০২৬ আসরের সবচেয়ে আলোচিত রূপকথা লিখছে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে! জনসংখ্যা ছয় লাখেরও কম, ফুটবল অবকাঠামো কিংবা তারকাসমৃদ্ধ স্কোয়াড-কোনো দিক থেকেই যাদের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে তুলনা চলে না, সেই দলই প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলেই জায়গা করে নিয়েছে শেষ ৩২-এ! তিন ম্যাচে একটিও জয় না পেলেও তিনটি ড্র-ই তাদের জন্য ইতিহাস গড়ার উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সময় গতকাল শনিবার হিউস্টনে গ্রুপ ‘এইচ’-এর শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে কেপ ভার্দে নিশ্চিত করে নকআউট পর্বের টিকিট। তিন ম্যাচ শেষে তিন পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে শেষ ৩২-এ উঠেছে তারা। অন্যদিকে একটি হার ও দুটি ড্র নিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে সৌদি আরবকে।

তবে কেপ ভার্দের এই সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল গ্রুপের প্রথম দুই ম্যাচেই। নিজেদের বিশ্বকাপ অভিষেকে প্রথম ম্যাচে তারা সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেয়। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে আরেক সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে দলটি। টানা দুই শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পয়েন্ট আদায়ের পর সৌদি আরবের সঙ্গে আরেকটি ড্র তাদের ইতিহাসের দরজা খুলে দেয়।

গ্রুপ রানার্সআপ হওয়ায় শেষ ৩২-এ কেপ ভার্দের প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আগামী ৪ জুলাই মায়ামিতে বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় মুখোমুখি হবে দুই দল। বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচটি কেপ ভার্দের জন্য হতে যাচ্ছে তাদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এক সময় আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রায় অপরিচিত ছিল কেপ ভার্দে। আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা দেশটি অনেকের কাছেই এখনও পরিচিত ‘কেপ ভার্দে’ নামে। তবে ২০১৩ সালে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে তাদের পর্তুগিজ নাম ‘কাবো ভের্দে’ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। ‘কাবো ভের্দে’ শব্দের অর্থ ‘সবুজ অন্তরীপ’। এখন সেই নামই ধীরে ধীরে ফুটবল বিশ্বের নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।

আজকের এই সাফল্য অবশ্য রাতারাতি আসেনি। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি পর্তুগালকে ২-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্ব ফুটবলের নজর কেড়েছিল কেপ ভার্দে। সেই জয় ছিল কেবল একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং নিজেদের সামর্থ্যের ঘোষণা। এরপর ধারাবাহিক উন্নতির পথ ধরে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেওয়া এবং অভিষেক আসরেই নকআউটে ওঠাণ্ডসব মিলিয়ে দেশটির ফুটবল ইতিহাসে এটি সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়!

এদিকে গ্রুপের অন্য ম্যাচে স্পেন উরুগুয়েকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে পরের পর্বে উঠেছে। আর কেপ ভার্দে রানার্সআপ হয়ে নিশ্চিত করেছে নকআউট। এখন ফুটবলপ্রেমীদের চোখ মায়ামির দিকে। কারণ সেখানে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মাঠে নামবে এমন এক দল, যারা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে-বিশ্বকাপে নামের চেয়ে লড়াইয়ের মানসিকতাই অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে!

কারণ, স্পেন-উরুগুয়ের মতো দেশকে গোলশূন্য সমতায় আটকে দেওয়া কেপ ভার্দে কোচের মতে– ‘কিছুই অসম্ভব নয়।’ কেপ ভার্দের কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিটো, ‘বুবিস্তা’ নামে অধিক পরিচিত এই ব্যক্তি তার দল নিয়ে ফুটবলবিশ্বে আলোড়ন তৈরি করেছেন। যারা বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচ জেতেনি, এমনকি হারেনি একটি ম্যাচও। ‘এইচ’ গ্রুপে সাবেক দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র করার পর সৌদি আরবের সঙ্গেও তারা একই ফল দেখেছে। ৩ পয়েন্ট নিয়ে তারা গ্রুপের দ্বিতীয় এবং ২ পয়েন্ট নিয়ে তিনে থাকা উরুগুয়ের বিদায় নিশ্চিত হয়।

সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের নকআউটে ওঠার রেকর্ডটা জানা ছিল না বুবিস্তার, ‘আমরাই কি এমন কিছু করেছি? আমি জানতাম না।’ এরপর তিনি বলেন, ‘তাহলে আমরা এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলাম, যা প্রমাণ করে যে সঠিক লক্ষ্য, দৃঢ় সংকল্প এবং সুসংগঠিত কর্মপদ্ধতি থাকলে ছোট দেশগুলোরও বড় লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। আমরা দেখিয়ে দিয়েছি কোনো কিছু অসম্ভব নয়। আমরা কেবল আমাদের দেশেরই প্রতিনিধিত্ব করিনি, বরং সমগ্র আফ্রিকা এবং বিশ্বের অন্যান্য ছোট দেশগুলোরও প্রতিনিধিত্ব করেছি।’

সাড়ে পাঁচ লাখেরও কম জনসংখ্যার আফ্রিকান দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। সেখানকার মানুষের জন্য গর্বের মুহূর্ত এনে দেওয়া কোচ বলেন, ‘আমি সবসময়ই বলে এসেছি যে, আজ হোক বা কাল কেপ ভার্দে ঠিকই এমন এক মঞ্চে উঠে আসবে। অবশ্য এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন, তবে আমরা ধাপে ধাপে অনেক বাধা পেরিয়ে এসেছি। আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি যে প্রতিকূলতাকে ভয় পাওয়া উচিত নয়।’ শিষ্যদের কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও সবার মাঝে সমন্বয়েই এমন ফল বলে জানান বুবিস্তা, ‘এখন আমরা নক-আউট পর্বে। আমাদের দেশের মানুষের জন্য, যারা আমাদের দলের সঙ্গে একাত্মবোধ করেন তাদের জন্য এবং বিশেষ করে খেলোয়াড়দের জন্য এটি দারুণ এক ব্যাপার। তারা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দেওয়ার পাশাপাশি দৃঢ় মানসিকতা ও শৃঙ্খলার পরিচয় দিয়েছে। এসবের সমন্বয় ঘটলে এমন ফলাফল পাওয়া যায়।’

আসন্ন ম্যাচ নিয়ে দেশটির কোচ বলছেন, ‘প্রথমত আমরা আর্জেন্টিনার সঙ্গে খেলার সুযোগ পেয়ে গর্বিত। এটি এমন এক দেশ যাদের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্ক আছে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে– প্রতিপক্ষ কারা তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করে লড়তে চাই। আমরা জানি আর্জেন্টিনার বিশ্বের সেরা কিছু খেলোয়াড় আছে, এর মধ্যে মেসিকে অনেকেই সর্বকালের সেরা হিসেবে জানেন। এটিও আনন্দের অন্যতম কারণ। শুরু থেকেই আমরা বলে আসছি এটি (বিশ্বকাপ) বাকি বিশ্বের কাছে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ভালো সুযোগ। আমাদের দেশের জন্য এটি অসাধারণ বিষয়।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত