
ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার সেমিফাইনাল ম্যাচের জন্য আলাদা করে গল্প তৈরির প্রয়োজন পড়ে না। তবে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় হতে যাওয়া এ হাইভোল্টেজ ম্যাচটি মাঠের লড়াইকে ছাপিয়ে অন্য মাত্রা পাচ্ছে। সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দশকের পর দশক ধরে চলা ফুটবলীয় রোমাঞ্চ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে শীর্ষ চারে ওঠা দুই দলের লড়াইয়ের গল্প।
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের শিরোপা জয় থেকে শুরু করে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের রাজনৈতিক ছায়া, কিংবা ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল থেকে শুরু করে ১৯৯৮ ও ২০০২ সালের ঐতিহাসিক মাঠের লড়াই-সব মিলিয়ে এই দুই দেশের দ্বৈরথ বরাবরই নিছক ফুটবলের চেয়ে অনেক বেশি কিছু হয়ে ধরা দিয়েছে। তবে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় এবং কোচ লিওনেল স্কালোনি এই দ্বৈরথকে ঘিরে তৈরি হওয়া আবেগকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের মতে, সেমিফাইনালের এই ম্যাচটিকে ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিরোপা জয়ের পথে আরেকটি সাধারণ ধাপ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি বলেন, ‘আমাদের এই ম্যাচটিকে স্বাভাবিকভাবেই নিতে হবে। এটি বিশ্বকাপের একটি সেমিফাইনাল, যেখানে প্রতিপক্ষ একটি শক্তিশালী ও দারুণ দল। লড়াইয়ের জন্য নিজেদের সেরা অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করাই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য।’
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সংগ্রাম করে এবার শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে। অতিরিক্ত সময়ে কেপ ভার্দেকে ৩-২ ব্যবধানে হারানোর পর, মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচের শেষ ১১ মিনিটে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় পায় তারা। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা।
পরপর কয়েকটি নকআউট ম্যাচে কঠিন লড়াই করে জয়ের পর ৩৯ বছর বয়সী মেসি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, এই টুর্নামেন্ট তাদের শারীরিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের ধকল ফেলেছে। অন্যদিকে, সেমিফাইনালের পথটা ইংল্যান্ডের জন্যও সহজ ছিল না।
থমাস টুখেলের শিষ্যরা শেষ ষোলোর ম্যাচে মেক্সিকো সিটির প্রতিকূল আবহাওয়ায় ১০ জন নিয়ে খেলে মেক্সিকোকে হারিয়ে টিকে থাকে। এরপর গত ১১ জুলাই মায়ামির তীব্র গরম ও আর্দ্রতার মধ্যে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয়তায় নরওয়েকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে থ্রি লায়নসরা। এই যাত্রায় ইংলিশদের স্বপ্নসারথি হয়ে উঠেছেন জুড বেলিংহাম। রিয়াল মাদ্রিদের ২৩ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার মেক্সিকোর বিপক্ষে জোড়া গোল করার পর নরওয়ের বিপক্ষেও জোড়া গোল করেছেন, যা দলে তার অপরিহার্য অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করেছে। হ্যারি কেন এখনও দলের অধিনায়ক এবং আক্রমণের মূল ভরসা হলেও, ধীরে ধীরে এই টুর্নামেন্টটি যেন বেলিংহামেরই হয়ে উঠছে। তবে টুখেল ভালো করেই জানেন, শুধু ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দিয়ে হয়তো পার পাওয়া যাবে না। ইংল্যান্ড কোচ তার দলের খেলার কিছু দিক নিয়ে খোলাখুলিভাবেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, দলের খেলায় আরও বেশি নিখুঁত ভাব এবং নিয়ন্ত্রণ আনা প্রয়োজন।
আর্জেন্টিনার স্বপ্ন যথারীতি আবর্তিত হচ্ছে লিওনেল মেসিকে কেন্দ্র করেই। টুর্নামেন্টে ইতোমধ্যে আটটি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে রয়েছেন তিনি। মজার ব্যাপার হলো, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবেন মেসি। ফলে দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক এই ফুটবল দ্বৈরথে যুক্ত হতে যাচ্ছে এক নতুন রোমাঞ্চকর অধ্যায়।
ইতিহাসের সেই আবহ : ম্যানচেস্টার সিটি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার কার্লোস তেভেজ মনে করেন, অতীতের সেই ইতিহাসের প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। ইএসপিএন আর্জেন্টিনাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘১৯৮৬ সালে ডিয়েগো যা করেছিলেন, তারা নিশ্চয়ই তার প্রতিশোধ নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তারা ওই ম্যাচটির কথা ভাবে এবং সেই কারণে ডিয়েগোর প্রতি তাদের এক ধরনের ভালোবাসা ও ঘৃণার মিশ্র অনুভূতি রয়েছে। সেই ইতিহাস আজও জীবন্ত।’
আর্জেন্টিনার জন্য সেমিফাইনালের পথটা তুলনামূলক সহজ মনে হলেও, সহজ প্রতিপক্ষদের বিপক্ষেই বারবার ধুঁকতে হয়েছে তাদের। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের ১৯ নম্বরে থাকা সুইজারল্যান্ডই ছিল এ পর্যন্ত তাদের মুখোমুখি হওয়া সবচেয়ে শক্ত প্রতিপক্ষ। তা সত্ত্বেও প্রতিটি রাউন্ডেই স্কালোনির শিষ্যদের কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে।
তেভেজ আরও বলেন, ‘এই দলটিকে বিশ্লেষণ করা খুবই কঠিন। আমার মনে হয়, বর্তমান দলটিতে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই শেষ পর্যন্ত ব্যবধান গড়ে দিচ্ছে।’ অপরদিকে, ইংল্যান্ডও কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে আর্জেন্টিনার মতোই কঠিন লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়ে মাঠে নামবে। ‘স্টিক টু ফুটবল’ পডকাস্টে সাবেক ইংলিশ ফরোয়ার্ড ইয়ান রাইট বলেন, ‘আর্জেন্টিনার খেলা দেখে আমার মনে হয়েছে আমরা ওদের হারাতে পারব। ওরা যেভাবে চাপা জায়গায় খেলে, আমার মনে হয় আমরা ওদের আক্রমণ রুখে দিয়ে পাল্টা আক্রমণে ভাঙতে পারব।’
আর্জেন্টিনার রয়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস এবং নিজস্ব শক্তির ওপর অগাধ বিশ্বাস। অন্যদিকে ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে এসেছে ভালো খেলে, সঙ্গে রয়েছে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন এক মিডফিল্ডার। অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্তে সমৃদ্ধ এই ঐতিহাসিক দ্বৈরথে এবার আটলান্টা অপেক্ষা করছে আরেকটি নতুন অধ্যায়ের জন্য। কারণ, এই ম্যাচের ফলই নির্ধারণ করবে বিশ্বকাপের ফাইনালে কারা জায়গা করে নেবে।