
খেলার মাঠে খেলাধুলার পরিবেশ থাকার কথা! অথচ রাজধানীর কমলাপুর শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে সেই পরিবেশের বদলে চলছে অটোরিকশার ব্যবসা। গ্যালারির নিচে দোকান, অটোরিকশার গ্যারেজ, অপরিচ্ছন্ন ড্রেসিংরুম ও ওয়াশরুমণ্ডসব মিলিয়ে স্টেডিয়ামের বেহাল চিত্র দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে তিনি স্টেডিয়ামের দোকানগুলোর চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে প্রশাসক শফি কামালকে সাময়িক বরখাস্ত করেছেন। গতকাল রোববার দুপুরে কমলাপুর স্টেডিয়াম পরিদর্শনে যান আমিনুল হক। সেখানে গিয়ে খেলোয়াড় ও সংবাদকর্মীদের জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন স্থাপনার দুরবস্থা, ময়লা-আবর্জনা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখতে পান তিনি। মাঠের গ্যালারির নিচে থাকা দোকানগুলোর মধ্যে ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের পরিবর্তে অটোরিকশার ব্যবসা চলতে দেখে আরও ক্ষুব্ধ হন প্রতিমন্ত্রী।
স্টেডিয়ামের সার্বিক পরিবেশ দেখে নিজের হতাশার কথা জানিয়ে আমিনুল হক বলেন, ‘আজ স্টেডিয়ামে এসে আমি হতাশ হয়েছি। একটা ক্রীড়া স্থাপনার পরিবেশ কখনও এমন হতে পারে না। ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত জনবল না থাকার কারণে এই অবস্থা হয়েছে।’
খেলোয়াড়দের জন্য তৈরি ড্রেসিংরুম, ওয়াশরুম এবং সংবাদকর্মীদের প্রেসবক্সের অবস্থাও সন্তোষজনক নয় বলে জানান তিনি। বলেন, ‘দেখুন, খেলোয়াড়দের জন্য স্টেডিয়াম। ড্রেসিংরুমের পরিবেশ যাচ্ছেতাই। ওয়াশরুমও তাই। প্রেসবক্সের অবস্থাও যাচ্ছেতাই। সিঁড়ির নিচে অনেক ময়লা পড়ে আছে, যেটা মানা যায় না। পাশাপাশি এই স্টেডিয়ামে দোকান ভাড়া দেওয়া হয় বা বরাদ্দ দেওয়া হয়; কিন্তু সেখানে ক্রীড়াবিষয়ক কিছু নেই। এখানে অটোরিকশার ব্যবসা চলছে।’
স্টেডিয়ামের ভেতরে অটোরিকশার গ্যারেজ পরিচালনার কারণে বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন প্রতিমন্ত্রী, ‘এই অটোরিকশার কারণে বিদ্যুতের অনেক ব্যয় হচ্ছে। সরকার যেখানে বিদ্যুতের ব্যাপারে খুবই সজাগ, কীভাবে সঠিক ব্যবহার করা যায়, সেটা ভাবছে, কিন্তু এখানে এসে দেখছি প্রচুর পরিমাণ বিদ্যুতের ব্যয় হচ্ছে। আমাদের ঘরবাড়িতে লোডশেডিংয়ে ভুগছি, অথচ তারা এখানে বিদ্যুতের অপচয় করছে। এসব রোধ করতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি কমলাপুর স্টেডিয়াম এলাকায় যতগুলো দোকান আছে, সেগুলোর চুক্তি বাতিল করব। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, স্টেডিয়ামের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। সেটি আমরা নিশ্চিত করতে চাই।’
স্টেডিয়ামের দোকানগুলো ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। আমিনুল হক বলেন, ‘স্টেডিয়ামের দোকানের চুক্তি বাতিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই ভাড়া দরকার নেই। এখানে যে সব ফেডারেশন, ক্লাবের স্থান সংকট তাদের স্থানান্তর করা যেতে পারে।’ অর্থাৎ বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জায়গায় স্টেডিয়ামের অব্যবহৃত স্থানগুলো ফেডারেশন ও ক্লাবের কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। অটোরিকশার গ্যারেজ সরিয়ে সেখানে ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার কথাও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
অব্যবস্থাপনার জন্য স্টেডিয়ামের প্রশাসকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমিনুল হক বলেন, ‘দেখুন, কমলাপুর স্টেডিয়ামের প্রশাসককে দায়িত্বে অবহেলার জন্য সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। যে পরিবেশ আমরা তৈরি করতে চাই, তার জন্য আমাদের জনবল লাগবে। বলছি না যে, রাতারাতি সব ঠিক করে ফেলব, তবে সব স্টেডিয়ামগুলোয় ক্রীড়াবান্ধব পরিবেশ আনতে চাই। এরই মধ্যে কমলাপুরের ড্রেসিংরুম, ওয়াশরুম, ক্যাম্প, প্রেসবক্স ও আবর্জনা সব পরিষ্কার করে নতুনভাবে কাজ করব। খেলোয়াড়দের জন্য ফ্যান বা এসি দেওয়া হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটা করতে চাই।’
কমলাপুর স্টেডিয়ামে বর্তমানে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আজ অথবা আগামীকালের মধ্যে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্টেডিয়ামকে মাদকমুক্ত করারও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। কমলাপুর স্টেডিয়ামে নারী ফুটবল দল ও জুনিয়র পর্যায়ের ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে খেলা শেষে খেলোয়াড়দের ড্রেসিংরুম ব্যবহারে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসক শফি কামালকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি স্টেডিয়ামের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ক্রিকেট কোচ হিসেবেও কর্মরত।
এর আগে গত ১ মার্চ মন্ত্রী হওয়ার পর কমলাপুর স্টেডিয়াম পরিদর্শনে গিয়ে বিভিন্ন সংস্কারের কথা বলেছিলেন আমিনুল হক। কিন্তু কয়েক মাস পরও দৃশ্যমান পরিবর্তন না হওয়ায় এবার সরাসরি প্রশাসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামীকাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল কমলাপুর স্টেডিয়ামে যাবে।
দোকানগুলো খালি করার জন্য তাদের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে ড্রেসিংরুম, ওয়াশরুম, প্রেসবক্স, ক্যাম্প ও স্টেডিয়ামের অন্যান্য অংশ সংস্কার ও পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হবে।