
মিরপুরের স্পিনস্বর্গে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। প্রথম ইনিংসে ২৭ রানের লিডও আদায় করে নিয়েছিল স্বাগতিকরা। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট হাতে আবারও চেনা দুর্বলতার প্রদর্শনী। ৭৯ রান তুলতেই ৬ উইকেট হারিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই হাতছাড়া করার পথে বাংলাদেশ।
দিন শেষে দলের লিড ১০৬ রান হলেও সেই পুঁজিকে এখনও নিরাপদ বলার সুযোগ নেই।
ঢাকা টেস্টে আজ তৃতীয় দিনটি বাংলাদেশের জন্য তাই স্বস্তি ও শঙ্কার মিশ্র গল্প হয়ে থাকল। একদিকে বল হাতে দুর্দান্ত নাঈম হাসান, অন্যদিকে ব্যাট হাতে দলের একের পর এক আত্মসমর্পণ। শেষ পর্যন্ত দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগেই যেন বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের আলোও নিভে আসছিল।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের ২৭২ রানের জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেমেছে ২৪৫ রানে। সফরকারীদের ইনিংস গুটিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রেখেছেন নাঈম হাসান। মাত্র ১০ ওভার বল করার সুযোগ পেয়েও ৩৩ রানে ৪ উইকেট শিকার করেছেন তিনি। বিশেষ করে শেষ দিকে তার স্পিনেই মাত্র ১১ রানের মধ্যে শেষ চার উইকেট হারায় ক্যারিবীয়রা। তাতে ২৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড পায় বাংলাদেশ।
কিন্তু ব্যাটিংয়ে নামতেই সেই লিডের স্বস্তি উধাও! দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের শুরুটাই ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। দলীয় স্কোরে মাত্র এক রান যোগ হতেই শামার জোসেফের বলে গালিতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তানজিদ হাসান তামিম। ব্যক্তিগত রানের খাতা খোলার আগেই শেষ হয় তার ইনিংস।
এরপর সাদমান ইসলাম ও নাজমুল হোসেন শান্তর সঙ্গে জুটি গড়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন তাওহিদ হৃদয়। কিন্তু সেই চেষ্টা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। রস্টন চেইসের ঘূর্ণিতে বোল্ড হয়ে ৩০ বলে ১৩ রান করে ফেরেন সাদমান। একই ওভারে দায়িত্বজ্ঞানহীন শট খেলতে গিয়ে জোসেফের হাতে ক্যাচ তুলে দেন হৃদয়। আগের ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান সাদমানের বিদায়ের পর হৃদয়ের উইকেট পতন বাংলাদেশের বিপদ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এরপর শান্তকেও বেশিক্ষণ আটকে রাখতে পারেনি ক্যারিবীয় বোলাররা। চেইসের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ৩৭ বলে ১০ রান করে ফেরেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। রিভিউ নিয়েও রক্ষা হয়নি তার। দলের বিপর্যয়ের মধ্যে বড় দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল অভিজ্ঞ ব্যাটারদের, কিন্তু কেউই সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেননি।
বিপর্যয়ের ধারাবাহিকতা থামেনি চা বিরতির পরও। বিরতিতে চার উইকেটে ৩৪ রান নিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। ফিরে এসেই ১০ বলে ৪ রান করে বিদায় নেন লিটন দাস। এরপর ৩২ বলে ৯ রান করে সাজঘরে ফেরেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ওয়ারিক্যানের বলে স্টাম্প হারিয়ে বাংলাদেশের চাপ আরও বাড়ান তিনি।
একের পর এক উইকেট হারিয়ে যখন দলের ইনিংস ভেঙে পড়ার উপক্রম, তখন প্রতিরোধের চেষ্টা শুরু করেন জাকের আলী অনিক ও নাঈম হাসান। ঘটনাচক্রে এই ম্যাচে সুযোগ পাওয়া জাকের এর আগে লিটন দাসের অনুপস্থিতিতে বদলি ফিল্ডার হিসেবে উইকেটকিপিং করেছিলেন। পরে মাথায় আঘাত পেয়ে ছিটকে যাওয়া মুমিনুল হকের কনকাশন বদলি হিসেবে ব্যাটিংয়ের সুযোগ পান তিনি।
সেই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন জাকের। নাঈমকে সঙ্গে নিয়ে দিনের শেষ দিকে কিছুটা আক্রমণাত্মক ব্যাটিংও করেছেন। দুজনের ব্যাট থেকেই এসেছে ১৮ রান করে। জাকের ৩২ বলে এক চারে অপরাজিত আছেন, নাঈমের ৩০ বলের ইনিংসে রয়েছে দুটি চার।
এই জুটিই আপাতত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা। কারণ, লিড ১০৬ রান হলেও মিরপুরের উইকেটে এই পুঁজি যে যথেষ্ট, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে লড়াইয়ের বাইরে রাখতে হলে দ্বিতীয় ইনিংসে অন্তত আরও কিছু রান যোগ করতে হবে বাংলাদেশকে।
বাংলাদেশের ব্যাটিং বিপর্যয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন রস্টন চেইস ও জোমেল ওয়ারিক্যান। চেইস ২৫ রানে নিয়েছেন তিনটি উইকেট। ওয়ারিক্যানের শিকার দুটি। অন্য উইকেটটি পেয়েছেন শামার জোসেফ।
এদিকে টানা তৃতীয় দিনের মতো আলোকস্বল্পতায় নির্ধারিত ৯০ ওভারের খেলা শেষ করা যায়নি। বৃষ্টিও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে তৃতীয় দিনে খেলা হয়েছে মাত্র ৬৪.৫ ওভার। তাতেই পড়েছে ১২টি উইকেট। ম্যাচের গতিপথ বিবেচনায় চতুর্থ দিনেই ফল নির্ধারণের সম্ভাবনা প্রবল।
তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনও সেই পুরোনো-ব্যাটিং বিপর্যয়ে দলকে টেনে তোলার মতো কেউ কি আছেন? এক-দুটি উইকেট পড়লেই পুরো ব্যাটিং লাইনআপের ভেঙে পড়ার প্রবণতা আবারও সামনে এসেছে। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে যে দুর্বলতা সাম্প্রতিক সময়ে ভুগিয়েছে দলকে, তার ছায়া এবার টেস্টেও স্পষ্ট।
প্রথম ইনিংসে বল হাতে নাঈম যে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট হাতেও সেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু একা তার পক্ষে কতটা সম্ভব, সেটাই এখন দেখার বিষয়। জাকেরকে সঙ্গে নিয়ে এই জুটি যতটা দীর্ঘ হবে, বাংলাদেশের ম্যাচে ফেরার সম্ভাবনাও ততটাই বাড়বে!
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ ১ম ইনিংসে: ২৭২/১০ ও ২য় ইনিংসে: ২৯ ওভারে ৭৯/৬ (জাকের ১৮*, নাঈম ১৮*, সাদমান ১৩; চেজ ৩/২৫)।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস: ৮২.৫ ওভারে ২৪৫/১০ (চন্দরপল ৫৬, ক্যাম্পবেল ৫৪, গ্রিভস ৪৬, চেজ ৪৩*; নাঈম ৪/৩৩, মিরাজ ২/৬৫ তাইজুল ২/৭৬)।