প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আল্লাহর নাম স্মরণের স্বাদ অন্য কিছুতে নেই। আল্লাহর জিকির বা স্মরণ এমন এক শক্তি, যা দুর্বলকে সবল করে এবং সব বিপদে দৃঢ়পদ রাখে। আল্লাহর জিকিরের মধ্যেই বান্দার সফলতা।
পবিত্র কোরআনে বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করতে বলা হয়েছে। কারণ, আল্লাহর স্মরণ এমন এক বিষয়, যা মানুষকে সব ধরনের গুনাহ থেকে রক্ষা করে এবং শরিয়ত মোতাবেক চলতে সাহায্য করে।
আল্লাহর জিকির হচ্ছে যাবতীয় ইবাদতের আত্মা। আল্লাহকে স্মরণ করলে তিনিও বান্দাকে স্মরণ করেন। আল্লাহ বলেন, 'তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব। কৃতজ্ঞতা আদায় করো, অকৃতজ্ঞ হয়ো না।' (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫২)
আল্লাহর স্মরণে সকাল-সন্ধ্যা অনেক দোয়া ও জিকির করা যেতে পারে। এখানে কয়েকটি দোয়া ও জিকির উল্লেখ করা হলো—
১. হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, সাইয়েদুল ইসতেগফার হলো—
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আনতা রব্বি লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খলাকতানি ওয়া আনা আব্দুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়াদিকা মাস্তাতাতু। আউজু বিকা মিন শাররি মা সানাতু, আবুউ লাকা বিনিমাতিকা আলাইয়া, ওয়া আবুউ বিজাম্বি, ফাগফির লি, ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি আমার প্রতিপালক, আপনি ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি আমার সাধ্য মতো আপনার (তাওহিদের) অঙ্গীকার ও (জান্নাতের) প্রতিশ্রুতির ওপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। আপনি আমাকে যে নেয়ামত দিয়েছেন আমি তা স্বীকার করছি এবং আমার অপরাধও স্বীকার করছি। অতএব, আপনি আমাকে মাফ করে দিন। নিশ্চয় আপনি ছাড়া পাপরাশি ক্ষমা করার কেউ নেই।
মহানবী (সা.) বলেন, 'যে দিনের বেলায় বিশ্বাসের সঙ্গে এ বাক্যগুলো বলবে এবং সে দিন সন্ধ্যার আগে মারা যাবে সে ব্যক্তি জান্নাতের অধিবাসী হবে। আর যে ব্যক্তি রাতের বেলায় এ বাক্যগুলো বলবে এবং সকাল হওয়ার আগে মারা যাবে সে ব্যক্তি জান্নাতের অধিবাসী হবে।' (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৬)
২. আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহিএ অর্থ: আমি আল্লাহর প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি) সকালে ১০০ বার ও সন্ধ্যায় ১০০ বার পড়বে, কিয়ামতের দিন তার চেয়ে উৎকৃষ্ট কিছু কেউ নিয়ে আসতে পারবে না। তবে সে ব্যক্তি ছাড়া যে তার মতো বলবে বা তার চেয়ে বেশি আমল করবে।' (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯২)
৩. আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, 'এক লোক নবী (সা.)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, গত রাতে আমাকে একটা বিচ্ছু কামড় দেওয়ায় কী কষ্টটাই না পেয়েছি! তিনি বললেন, তুমি যদি সন্ধ্যাকালে বলত্তে
উচ্চারণ: আউজু বিকালিমা তিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাকা
অর্থ: আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের উসিলায় আমি তাঁর কাছে তাঁর সৃষ্টির ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাই) তাহলে তোমার কোনো ক্ষতি হতো না।' (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭০৯)
৪. হাদিসে আছে, একবার আবু বকর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি যখন সকালে উপনীত হই ও সন্ধ্যায় উপনীত হই তখন কী বলব আমাকে শিখিয়ে দিন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আবু বকর, আপনি বলুন—
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ফাতিরিস সামা ওয়াতি ওয়াল আরজি, আলিমাল গাইবি ওয়াশ শাহাদাতি, লা ইলাহা ইল্লা আনতা, রব্বা কুল্লি শাইইন ওয়া মালিকাহু, আউজু বিকা মিন শাররি নাফসি ওয়া মিন শাররিশ শাইতানি ওয়া শিরকিহি, ওয়া আন আকতারিফা আলা নাফসি সুওআন আও আজুররাহু ইলা মুসলিম।
অর্থ: হে আল্লাহ, হে আসমানসমূহ ও জমিনের স্রষ্টা! হে গায়েব ও উপস্থিতের জ্ঞানধারী, আপনি ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই। হে সব কিছুর রব ও মালিক, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই আমার আত্মার অনিষ্ট থেকে এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে ও তার শিরক বা ফাঁদ থেকে এবং আমার নিজের কোনো ক্ষতি করা অথবা কোন মুসলিমের ক্ষতি করা থেকে। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫২৯)
৫. ইবনে উমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সকাল বেলা ও সন্ধ্যা বেলা এ দোয়াগুলো পড়া বাদ দিতেন না—
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফওয়া ওয়াল আফিয়াতা ফিদ্দুনইয়া ওয়াল আখিরাহ। আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফওয়া ওয়াল আফিয়াতা ফি দিনি ওয়াদুনইয়াইয়া, ওয়া আহলি ওয়া মালি, আল্লাহুম্মাসতুর আওরাতি ওয়া আমিন রাওআতি। আল্লাহুম্মাহ ফাজনি মিম্বাইনি ইয়াদাইয়্যা ওয়া মিন খালফি ওয়া আন ইয়ামিনি ওয়া শিমালি ওয়া মিন ফাওকি। ওয়া আউজু বি আজামাতিকা আন উগতালা মিন তাহতি)।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি। হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে ক্ষমা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি আমার দ্বীনদারি ও দুনিয়ার, আমার পরিবার ও সম্পদের। হে আল্লাহ, আপনি আমার গোপন ত্রুটিসমূহ ঢেকে রাখুন, আমার উদ্বিগ্নতাকে নিরাপত্তায় পরিণত করে দিন। হে আল্লাহ, আপনি আমাকে হেফাজত করুন আমার সামনের দিক থেকে, আমার পেছনের দিক থেকে, আমার ডান দিক থেকে, আমার বাম দিক থেকে এবং আমার ওপরের দিক থেকে। আর আপনার মহত্ত্বের উসিলায় আশ্রয় চাই আমি নিচ থেকে হঠাৎ ধ্বংস হওয়া থেকে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৭৪)
৬. আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, তিনি নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি সকাল বেলা বলতেন—
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বিকা আসবাহনা ওয়াবিকা আমসাইনা ওয়াবিকা নাহইয়া, ওয়াবিকা নামুতু ওয়া ইলাইকান নুশুর।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনার অনুগ্রহে আমরা সকালে উপনীত হয়েছি। আপনার অনুগ্রহে আমরা বিকালে উপনীত হয়েছি। আপনার দ্বারা আমরা বেঁচে থাকি। আপনার দ্বারা আমরা মৃত্যুবরণ করি। আপনার কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন।
যখন সন্ধ্যাতে উপনীত হতেন তখন বলতেন—
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বিকা আমসাইনা, ওয়া বিকা আসবাহনা, ওয়া বিকা নাহইয়া, ওয়া বিকা নামুতু ওয়া ইলাইকাল মাসির।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনার অনুগ্রহে আমরা সন্ধ্যায় উপনীত হয়েছি। আপনার অনুগ্রহে আমরা সকালে উপনীত হয়েছি। আপনার দ্বারা আমরা বেঁচে থাকি। আপনার দ্বারা আমরা মৃত্যুবরণ করি। আপনার কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৬৮)
৭. রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির।
অর্থ: এক আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই। তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই। সমস্ত প্রশংসাও তাঁর। তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান দিনে একশত বার বলব্তেএটা তার জন্য দশজন দাসমুক্তির অনুরূপ হবে, তার জন্য একশত সওয়াব লেখা হবে, সে দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত এটা তার জন্য শয়তান থেকে সুরক্ষা হবে। সে যে সওয়াব পাবে আর কেউ তার চেয়ে উত্তম সওয়াব পাবে না; তবে হ্যাঁ কেউ যদি তার চেয়ে বেশি আমল করে সে পাবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৪০)
৮. রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি সকালে উপনীত হলে বলে—
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু, ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির।
অর্থ: এক আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও তাঁর, আর তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান) সেটা তার জন্য ইসমাইলের বংশধর একজন দাসমুক্তির সমান, তার জন্য দশটি সওয়াব লেখা হয়, তার দশটি গুনাহ মাফ করা হয়, তার ১০ স্তর মর্যাদা উন্নীত করা হয় এবং সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত এটি তার জন্য শয়তান থেকে সুরক্ষাকারী হয়। যদি সন্ধ্যায় উপনীত হলে এ বাক্যগুলো পড়ে তাহলে সকাল হওয়া পর্যন্ত সে ব্যক্তি সমধরণের সওয়াব পায়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৭৭)
৯. রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'কোনো মুসলিম যখন সকালে উপনীত হয় কিংবা সন্ধ্যায় উপনীত হয় তখন যদি ৩ বার বলে
উচ্চারণ: রজিতু বিল্লাহি রব্বান, ওয়াবিল ইসলামি দিনান, ওয়াবি মুহাম্মাদিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা নাবিইয়ান।
অর্থ: আল্লাহকে রব, ইসলামকে ধর্ম হিসেবে ও মুহাম্মাদ (সা.)-কে নবীরূপে গ্রহণ করে আমি সন্তুষ্ট) আল্লাহর কাছে তার অধিকার হয়ে যায় তাকে কেয়ামাতের দিন সন্তুষ্ট করা। (ইমাম আহমাদ, হাদিস: ১৮৯৬৭)
১০. উসমান বিন আফফান (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি ৩ বার বলব্তে
উচ্চারণ: বিসমিল্লা হিল্লাজি লা ইয়াদুররুহু মাআ ইসমিহি শাইউন ফিল আরজি ওয়ালা ফিস সামা-ই, ওয়া হুয়াস্ সামিউল আলিম।
অর্থ: আল্লাহর নামে (সব অনিষ্ট থেকে সাহায্য চাই), যার নাম (স্মরণের) সঙ্গে আসমান ও জমিনে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। আর তিনি সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী) সে ব্যক্তি সকাল পর্যন্ত কোনো আচমকা বিপদে আক্রান্ত হবে না। যে ব্যক্তি সকাল বেলা এ বাণীগুলো ৩ বার পড়বেন সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত সে ব্যক্তি কোন আচমকা বিপদে আক্রান্ত হবেন না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৮৮)
এ ছাড়া 'আল্লাহু আকবার', 'সুবাহানাল্লাহ', 'আলহামদুলিল্লাহ'সহ কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত অন্যান্য দোয়া পড়া যেতে পারে।