ঢাকা শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৮ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ইতিহাসে রোজা

আদনান রহমান
ইতিহাসে রোজা

পৃথিবীতে মানুষের পথচলার শুরু থেকেই রোজার সূচনা। আদি পিতা আদম (আ.) প্রথম জমিন চাষ করার মাধ্যমে খাবার শুরু করেন এবং তার ওপরই অর্পিত হয় রোজার বিধান। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা খোদাভীরু হতে পার।’ (সুরা বাকারা : ১৮৩)। বিখ্যাত মুফাসসির আল্লামা আলুসি (র.) বলেছেন, এ আয়াতে ‘মিনকাবলিকুম’ দ্বারা হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হজরত ঈসা (আ.) পর্যন্ত সব নবী-রাসুলের যুগ বোঝানো হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা হজরত আদম (আ.)-কে জান্নাতে একটি গাছের ফল খেতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিশেষ এক ধরনের রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন। এটিই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম রোজা। হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.) শয়তানের প্ররোচনায় ওই গাছের ফল ভক্ষণ করেছিলেন এবং এর পরিণামে আল্লাহ তায়ালা তাদের ভূপৃষ্ঠে পাঠিয়ে দিলেন। অতঃপর তারা ওই ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা-ইস্তিগফার করেন এবং এর কাফফারাস্বরূপ ধারাবাহিক ৪০ বছর রোজা রেখেছিলেন। (তাফসিরে রুহুল মাআনি)।

হজরত আদম (আ.)-এর পর অন্য সব নবী-রাসুলের জমানায়ও রোজার বিধান ছিল। তবে তাদের রোজা পালনের পদ্ধতি ভিন্নতর ছিল। হজরত নুহ (আ.)-এর ওপরও রোজা ফরজ ছিল; রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, হজরত নুহ (আ.) ১ শাওয়াল ও ১০ জিলহজ ব্যতীত সারা বছর রোজা রাখতেন (ইবনে মাজাহ)। হজরত মুসা (আ.)-এর ওপর তাওরাত কিতাব অবতীর্ণ হওয়ার আগে তিনি ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ তায়ালা তার ওপর ওহি নাজিল করলেন এবং আরও ১০ দিন রোজা রাখার নির্দেশ প্রদান করলেন। হজরত ইদ্রিস (আ.) বছরজুড়ে প্রতিদিন রোজা রাখতেন। হজরত দাউদ (আ.) এক দিন পরপর রোজা রাখতেন। হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলেন, পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপরও পূর্ণ এক মাস রোজা ফরজ ছিল। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ ছিল। (তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/৫০১)।

হিজরি দ্বিতীয় বছর উম্মতে মুহাম্মদির ওপর রোজা ফরজ করা হয়। অন্যান্য ধর্মে রোজার বিধান থাকলেও ইসলামের রোজা আর অন্য ধর্মের রোজায় পার্থক্য অনেক। ইহুদি ধর্মে রোজা শোক ও বেদনার প্রতীক। রোজা মুসলমানদের জন্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের পন্থা। উন্নত চরিত্র গঠনের উপায়। নৈতিকতা ও মানবিক গুণে গুণাম্বিত হয়ে গড়ে ওঠার কৌশল। রোজার ঐতিহাসিক গুরুত্বও অপরিসীম। প্রথম রোজায় হজরত ইব্রাহিম (আ.) সহিফা এবং ৬ রোজায় হজরত মুসা (আ.) তাওরাত লাভ করেন। ১৩ রোজায় ঈসা (আ.)-এর ওপর ইঞ্জিল, ১৮ রোজায় হজরত দাউদ (আ.) জাবুর এবং রমজানের ২৭ তারিখে মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ কুরআন অবতীর্ণ হয়।

ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধের সূচনা রমজানের ১৭ তারিখে। নবী দৌহিত্র হজরত হাসান (রা.)-এর জন্ম হয় ১৫ রোজায়। জান্নাতি নারীদের নেত্রী ফাতেমা (রা.)-এর মৃত্যু হয় ৩ রোজায়। হজরত খাদিজা ও হজরত আয়েশা (রা.)-এর শেষ বিদায় যথাক্রমে ১০ ও ১৭ রোজায়। ২১ রোজায় শেষ বিদায় নেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা। মুসলমানদের রোজা শুধু দিনব্যাপী উপোস থাকার ইতিহাস নয়, বিভিন্ন ঘটনার ইতিহাস ও সামাজিক বন্ধনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত