ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মওলানা রুমির হৃদয়াকাশের সূর্য শামসে তাবরিজি

ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
মওলানা রুমির হৃদয়াকাশের সূর্য শামসে তাবরিজি

শামসউদ্দিন মওলানা রুমির পথের দিশারী, যার সাক্ষাতে মওলানার আধ্যাত্মিক বিপ্লব এবং প্রেমের মহাসম্পদের সঙ্গে সংযোগ ঘটে। আল্লাহ-প্রেমের উত্তাল তরঙ্গমালায় মওলানার গোটা অস্তিত্ব তরঙ্গায়িত হয়।

তার পুরো নাম শামসউদ্দীন মুহাম্মদ ইবন আলি ইবন মালেকদাদ তাবরিজি। ৬ষ্ঠ হিজরির শেষভাগে তার জন্ম। তুরস্কের কৌনিয়ায় তার আগমনের দিনটি ছিল ৬৪২ হিজরির ২৬ জমাদিউল আখের শনিবার সকালবেলা। ৬৪৫ হিজরি পর্যন্ত তিনি কৌনিয়ায় অবস্থান করেন। তিনি মওলানা রুমির মুরিদান ও আত্মীয়দের রোষানলের শিকার হন। তার জীবনের শেষ পরিণতি জানা যায়নি। হজরত শামসে তাবরিজির সাক্ষাৎ লাভ ও সাহচর্যের গুণেই মওলানা রুমি চিরন্তন প্রেমের মহাসম্পদ লাভ করেন।

ওয়া’জেব আ’য়াদ চোন্কে আ’মাদ না’মে উ

শারহে রাম্জি গোফ্তান আয এন‘আ’মে উ

তার নাম যখন এসে পড়ল, তখন তার দয়া-

অনুগ্রহের কিছু রহস্য ব্যক্ত করা কর্তব্য হয়ে পড়ল।

ঈন নাফাস্ জা’ন দা’মনম বার তা’ফতে আস্ত

বুয়ে পীরা’ হা’নে ইউসুফ য়া’ফতে আস্ত

এ মুহূর্তে প্রাণ আমার আঁচল আঁকড়ে ধরেছে

সে যেন ইউসুফের জামার সুগন্ধ পেয়ে গেছে।

পুত্র ইউসুফকে হারানোর পর শোকে মূহ্যমান ইয়াকুব (আ.) ইউসুফ (আ.)-এর জামা পাওয়ার পর সে জামায় ইউসুফের সুগন্ধ অনুভব করেন, তাতে তার হারানো চোখের জ্যোতি ফিরে পান এবং ইউসুফের জন্য প্রাণ অধির অস্থির হয়ে ওঠে। মওলানা রুমির (রহ.) প্রাণও এখন যেন সেরূপ পাগলপারা হয়ে উঠেছে। প্রাণ দাবি জানাচ্ছে যে-

আয্ বরা’য়ে হক্কে সোহবত সা’লহা’

বা’যগু হা’লি আয আ’ন খোশহা’লহা’

বছরের পর বছর তার সাহচর্যের হক আদায়ের জন্যে

বলুন ওই মোবারক হাল তন্ময়তার কিছু রহস্য খুলে।

তা যামিন ও আ’সেমা’ন খান্দা’ন শাওয়াদ

আক্বল ও রুহ ও দীদে সাদ চন্দা’ন শাওয়াদ

যাতে যমিন ও আসমান হাস্যোজ্জ্বল হয়

বুদ্ধি, আত্মা ও চক্ষু শতগুণ প্রদীপ্ত হয়।

মনকে সম্বোধন করে মওলানা বলছেন-

লা’ তুকাল্লিফনী ফা ইন্নি ফিল ফানা

কাল্লাত্ আফহা’মী ফালা’ উহ্সী সানা’

আমাকে বাধ্য কর না, আমি ফানার মধ্যে নিমজ্জিত

আমার জ্ঞান-বুদ্ধি অকেজো তার প্রশংসায় সক্ষম নই।

কুল্লু শাইয়ীন ক্বালাহু গাইরুল মুফীক

ইন তাকাল্লাফ আও তাসাল্লাফ লা য়ালীক

সম্বিতহারা লোক যে কথাই বলুক না কেন

সাজানো কথা, প্রগল্ভতা কোনোটাই ঠিকমতো হয় না।

মান চে গূয়াম য়্যক রাগাম হুশ্য়া’র নীস্ত

শারহে আন য়া’রী কে ঊ রা’ য়া’র নীস্ত

আমি কী বলব, আমার একটি রগেরও চৈতন্য নেই

সেই বন্ধুর বর্ণনা কীভাবে দেব, যার কোনো বন্ধু নেই।

মওলানা রুমি (রহ.) শামসে তাবরিজির দীক্ষার রহস্য বর্ণনায় বার বার অপারগতা প্রকাশ করেছেন। বলছেন, তিনি আমাকে এমন বন্ধুর প্রেমে মাতোয়ারা করেছেন, যার কোনো বন্ধু নেই। অর্থাৎ সমকক্ষ, সদৃশ ও নজির নেই। আমি তার বর্ণনা কীভাবে দেব? কোনো সমকক্ষ, সাদৃশ্য ও নজির থাকলেই তো তার উপমা দিয়ে বুঝানো যেত সেই বন্ধু কেমন। তার চেয়েও বড় কথা আমি চৈতন্যহারা। তার প্রেমের সংযোগে আমার শরীরের একটি শিরাও সচল নেই। কাজেই মাতোয়ারার কথা সচেতন লোকেরা কীভাবে বুঝবে?

শারহে ঈন হিজরা’ন ও ঈন খো-নে জিগার

ঈন যামা’ন বুগয’ার তা’ ওয়াক্তে দিগার

এই বিরহজ্বালা, কলিজায় রক্তপাতের বর্ণনা,

এখন রেখে দাও, দেখা যাবে পরে এক সময়।

মওলানা আশরাফ আলি থানবি (রহ.) বলেন, বিরহজ্বালা ও কলিজায় রক্তপাত বলতে ওয়াহদাতুল ওয়াজূদের রহস্যের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন হওয়ার পর প্রেমিকের অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি পায়। সর্বক্ষণ সে বিরহ-যাতনায় ভোগে। কারণ প্রেমের পথে একটা স্তরে গিয়ে কেউ ক্ষান্ত হয় না। আরও উন্নতি, আরো সান্নিধ্যের জন্য অধীর অস্থির থাকে। তখন যেন সে অসহ্য বিরহ যন্ত্রণায় কাতরায়। এই কাতরানোকেই কলিজায় রক্তপাতের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তাই বলছেন যে, এ রহস্যের বর্ণনা এখন রেখে দাও। পরে এক সময় দেখা যাবে। যখন ফানা ও নিমজ্জমান অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসব, তখন শ্রোতার বোধ ও ধারণ ক্ষমতার মাত্রা অনুযায়ী সেই অতুলনীয় বন্ধু, নজিরবিহীন সত্তার প্রশংসা ও গুণাবলি বর্ণনা করতে পারব। কিন্তু মওলানার রূহ এ জবাবে সন্তুষ্ট হতে পারল না।

ক্বা’লা আত্‘ইম্নী ফা ইন্নি জা’য়েউন

ওয়া-‘তাজিল ফাল ওয়াক্তু সাইফুন্ ক্বা’তেউন

বলল : আমাকে খাবার দিন, আমি ক্ষুধার্ত

জলদি করুন, কারণ সময় ধারালো তলোয়ার তুল্য।

ধারালো তলোয়ার যেমন খুব দ্রুত চলে, তেমনি সময়ও দ্রুত পার হয়ে যায়। কাজেই কালক্ষেপণের সময় নাই। একজন সুফি হিসেবে আপনি কালক্ষেপণ করতে পারেন না।

সূফী ইবনুল ওয়াক্ত বা’শাদ এই রাফীক্ব

নীস্ত ফরদা’ গোফতান আয শারত্বে ত্বারীক

হে সাথি! সূফী তো সময়ের সন্তান

কালকের দোহাই দেওয়া নয় তরিকতের বিধান।

তো মাগার খোদ মার্দে সূফী নীস্তী

নাক্বদ রা’ আয্ নাস্য়া খীজাদ নীস্তী

তুমি কি তাহলে সুফি লোক নও

বাকীতে লেনদেনে আসলটাই যে উধাও।

কাশফ ও দিব্যজ্ঞানের অবস্থা বহাল থাকা অবস্থায় পরম বন্ধুর গুণাবলী ও পরিচয় ব্যক্ত করার তাগাদা দিচ্ছেন। মওলানা বলছেন, আমি রুহকে বুঝিয়ে বললাম :

গোফ্তামাশ্ পূশীদা খোশতর সিররে য়া’র

খোদ তো দার যেমনে হেকা’য়ত গূশ দা’র

তাকে বললাম, বন্ধুর রহস্য কথা গোপন থাকাই উত্তম

গল্পের ছলে বলে যাব, তুমি কান পেতে বুঝবার চেষ্টা কর।

খোশ্তর আ’ন বা’শাদ কে সিররে দিলবরা’ন

গোফতে আ’য়াদ দার হাদীসে দীগারা’ন

অতি সুন্দর লাগে, যখন প্রেমাস্পদের রহস্য

অন্যদের মুখে তা আলোচনার ছলে হয় ব্যক্ত।

পুরো মসনবি শরিফে এ পদ্ধতিই অনুসৃত হয়েছে। মওলানা রুমি তরিকত বা সাধনার পথের রহস্যাবলি পৃথক পৃথক শিরোনাম দিয়ে বা সরাসরি ব্যক্ত করেননি, বরং নানা গল্প, উপমা-উদাহরণের ফাঁকে ফাঁকে ব্যক্ত করেছেন। যাতে যারা বুঝার লোক তারা বুঝতে পারে। আর যারা বুঝবে না, তারা দূরে সরে যায়। মসনবিকে কাব্যে গল্পগ্রন্থ মনে করে অনেকের নিরাশ হবার কারণ এখানেই নিহিত। মোটকথা মওলানার এ কথায় রুহ সন্তুষ্ট হতে পারল না, অধীর হয়ে বলে উঠল :

গোফত মকশূফ ও বেরেহনে ও বী গ¦লূল

বা’যগূ দাফ্আম মদেহ্ এই বুল ফযূল

বলল : খোলামেলা, উন্মুক্ত লুকোচুরি ছাড়াই

বলে দাও, বাহানা দেখিওনা আমাকে হে গুণাধার!

পর্দা বার্দার ও বেরেহনে গূ কে মান

মী নাখাস্বাম বা’ সানাম্ বা’ পীরহান

পর্দা তুলে নাও, খোলামেলা বল, কারণ আমি

বধুয়ার সঙ্গে জামা নিয়ে ঘুমাবো না কিছুতেই।

গল্প, উপমার পর্দা সরিয়ে নাও, প্রিয়তমের রহস্য খোলামেলা বল। শ্রোতার রুচিতে মওলানা চাটনীর সংযোগ করেছেন দ্বিতীয় পংক্তিতে।

গোফতাম আর উরয়া’ন শাওয়াদ উ দার আয়া’ন

নাই তো মা’নী, নাই কিনা’রাত, নাই মিয়া’ন

বললাম, যদি তিনি উন্মুক্তভাবে হয়ে পড়েন প্রকাশমান

তুমি থাকবে না, তোমার আশপাশও না, নয় মাঝখান।

অর্থাৎ তিনি যদি আপন যাতের তাজাল্লি দান করেন তাহলে বস্তুজগত, অস্তিত্ব জগত সব ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে।

আ’রযু মী খা’হ লে-কে আন্দা’যা খা’হ্

বার নাতা’বাদ কূহ রা’ য়্যক বার্গে কা’হ

তুমি চাও, আর্জি পেশ কর, কিন্তু আন্দায মতো চাও

ঘাসের একটি পাতা তো পর্বতের ভার সইবে না।

আ’ফতা’বী কায্ ওয়াই ঈন আ‘লাম্ ফরুখ্ত্

আন্দাকী গার পীশ আ’য়াদ জুম্লা সূখ্ত্

যে সূর্যের দ্বারা আলোকিত এই জগত

কিঞ্চিত সামনে আসলে, জ্বলে ছারখার হবে সব।

সূর্যের আলোতে এ জগত উদ্ভাসিত। অথচ এই সূর্যও যদি তার কক্ষপথ হতে এক ডিগ্রি পৃথিবীর নিকটবর্তী হয়, তবে সবকিছু পুড়ে ছারখার হয়ে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। অনুরূপ হাকিকতের সূর্যও যদি মানুষের জ্ঞান ও বোধের চাইতে বেশি আলোকদান করে, তাহলে সবকিছু নাস্তানাবুদ হয়ে যাবে। মওলানা আরও বুঝিয়ে বলছেন রুহকে-

ফেতনে ও আশূব ও খূনরেযী মাজূ

বীশ্ আযীন আয্ শামসে তাব্রিযী মাগূ

গোলযোগ, বিপর্যয়, রক্তপাত চেয়ো না

এর বেশি আর শামসে তাবরিজির কথা বল না।

ঈন নদা’রদ আ’খের আয আ’গা’য গূ

রও তামা’মে ঈন্ হেকা’য়ত বা’য গূ

এটা এমন প্রসঙ্গ যার শেষ নেই। কাজেই

শুরু থেকে বল, যাও, কাহিনীর পুরোটা বর্ণনা কর।

মওলানা বলছেন, শামসে তাবরিজির দীক্ষিত প্রেম আল্লাহর প্রেম। এর শুরু আছে, শেষ নেই।

কাজেই চলো, শুরুতে ফিরে যাই। বাদশাহ-বাঁদীর প্রেম কাহিনিতে ফিরে যাই। মওলানা রুমি গায়েবি হেকিমকে রোগিণীর শিয়রে নিয়ে আমাদেরকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। বলা না বলায় আমাদের পরম সত্তার প্রেম রহস্যের যা কিছু শুনিয়েছেন তাতে দু’জনের সংলাপ ছিল মূখ্য চরিত্র।

মসনবির আধুনিক ভাষ্যকার করিম জামানির মতে এ সংলাপে প্রশ্নকর্তা ছিলেন মওলানার শিষ্য ও খলিফা মসনবির অনুলেখক হুসসামউদ্দীন চালাবি, জবাব দিয়েছেন মওলানা রুমি। কিন্তু হজরত থানবির মতে প্রশ্নকর্তা মওলানার রুহ। অর্থাৎ স্বয়ং মওলানাই প্রশ্নকর্তা ও জবাবদাতা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত