
যশোরের শার্শা–বেনাপোল সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আলোচিত মো. সাজু বদ্দিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
শুক্রবার রাতে তাকে আটক করার পর শার্শা থানায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে নিরাপত্তার স্বার্থে রাতেই তাকে কড়া পুলিশি পাহারায় যশোর জেলা সদরে স্থানান্তর করা হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যশোরের শার্শা উপজেলার পাঁচভুলট গ্রামের বাসিন্দা সাজু বদ্দির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকায় মাদক চোরাচালান, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল।
বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক, অস্ত্র এবং সহিংসতার ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করা হলেও এতদিন তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
একাধিক গুরুতর মামলার আসামি
পুলিশের নথি অনুযায়ী, সাজু বদ্দির বিরুদ্ধে অন্তত ছয়টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে শার্শা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়।
এসব মামলার এফআইআর নম্বর ৫৫/৪৯১ (৩১ অক্টোবর ২০১৮), ৩০/৪৬৬ (১৫ অক্টোবর ২০১৮) এবং ১৫/৪০৩ (৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮)। মামলাগুলোতে বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর ধারা ১৫(৩) ও ২৫-ডি এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ১৯০৮-এর ৪, ৫ ও ৬ ধারায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া ২০১৭ সালের ২২ মে শার্শা থানায় অস্ত্র আইনের ১৯(f)/১৯-৪ ধারায় দায়ের করা একটি মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি। ২০১৪ সালে একই থানায় দণ্ডবিধির ৪৪৭, ৩২৩, ৩২৬, ৩০৭, ৪২৭ ও ৫০৬ ধারায় একটি এবং ৩২৬, ৩০৭ ও ৫০৬ ধারায় আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায়ও তার নাম এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এসব মামলার বেশিরভাগই সহিংসতা, বিস্ফোরক ব্যবহার এবং অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে জড়িত।
আগেও গ্রেপ্তার, পরে ফের সক্রিয়
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২২ মে পাঁচভুলট গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে অস্ত্র আইনের মামলায় সাজু বদ্দিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় তার প্রভাব ছিল। অনেকেই ভয়ের কারণে প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পেতেন না।
সম্প্রতি শার্শার দাউদখালি গ্রামে সাজু বদ্দির নেতৃত্বে ১৫–২০ জনের সন্ত্রাসী দল মোটরসাইকেল যোগে গিয়ে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একটি নিরীহ কৃষক পরিবারকে মারধর ও আহত করেছে। এ ঘটনায় তাকে সহ ১৫–২০ জনের নামে শার্শা থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
একজন বাসিন্দা বলেন, “সাজুর নাম শুনলেই মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ত। এলাকায় তার দাপট ছিল।”
পুলিশি নথি বলছে, সাজু বদ্দির বিরুদ্ধে মাদক সংক্রান্ত অভিযোগও রয়েছে। ২০১৯ সালের ৪ জুলাই শার্শা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর ৩৬(১) ধারায় দায়ের করা একটি মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়। এছাড়া ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর বেনাপোল পোর্ট থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০-এর ১৯(১) ধারার ৩(খ) অনুযায়ী দায়ের করা আরেকটি মামলাতেও তার নাম রয়েছে। ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাজু বদ্দিকে আটক করে শার্শা থানায় নিয়ে আসে। গ্রেপ্তারের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তার সমর্থক ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজন থানার সামনে জড়ো হয়ে পড়ে।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, একপর্যায়ে উত্তেজিত কয়েকজন তাকে জোর করে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গ্রেপ্তারের পর কিছু লোক থানার সামনে ভিড় করেছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছি।”
পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে যশোর জেলা সদরে স্থানান্তর করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকায় মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। সাজু বদ্দিকে গ্রেপ্তারের খবরে অনেকেই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।
পাঁচভুলট গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, “অনেক দিন ধরে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ শুনে আসছি। এখন তাকে আটক করায় মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি সাজু বদ্দির বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর অগ্রগতি এবং তার অপরাধচক্রের সম্ভাব্য অন্যান্য সদস্যদের বিষয়েও তদন্ত চলছে।