
লুসাই বিধৌত কর্ণফুলীর তীরে গড়ে ওঠা বোয়ালখালী উপজেলার একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম হলো কধুরখীল। কালপরিক্রমায় কধুরখীল গ্রাম শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার নিজস্ব স্বকীয়তা আজও সমুজ্জ্বল। সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির মেলবন্ধনের অনন্য দৃষ্টান্ত এই গ্রাম। প্রতিটি ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মানুষ পরস্পরের কাঁধে কাঁধ রেখে কাজ করত অনায়াসে।
এলাকার মানুষের বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়ত অবলীলায়। দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই গ্রামের কৃতি সন্তানেরা গ্রামের নাম উজ্জ্বল করেছে, সঙ্গে দেশেরও।
ব্রিটিশ শাসনামলে শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ ও বর্ধনায় কাজ করেছেন নিরলসভাবে। নিজেদের স্বোপার্জিত অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। যে গ্রামে নিয়মিত মঞ্চস্থ হতো নাটক, বসত কবিগানের আসর, অনুষ্ঠিত হতো সাহিত্য সভা। গ্রামের যুবকেরা তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করত নিরলসভাবে।
সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা, সমাজের মানুষকে আলোকিত করা এবং যুবসমাজকে সত্য-সুন্দরে উদ্ভাসিত করতে এলাকার প্রবীণরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করতেন। যাদের মধ্যে অন্যতম বঙ্কিম চন্দ্র আইচ, নিরঞ্জন দাশগুপ্ত, ভূপতি ভূষণ চৌধুরী, রাজেন্দ্র চৌধুরী (খোকা), তিনকরি দাশগুপ্ত, মোঃ আবদুল হামিদ, বগলা চরণ চৌধুরীসহ আরও অনেকে। তাদের লক্ষ্য ছিল এলাকাকে সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত করা এবং পরস্পরের সহযোগী হয়ে থাকা।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা অগণিত দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীকে হারিয়েছি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দেশীয় দোসরদের সহায়তায় সুপরিকল্পিতভাবে বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করে। কধুরখীল গ্রামের এসব কৃতি ব্যক্তিরা মুক্তিযুদ্ধে যেমন সক্রিয় ছিলেন, তেমনি এলাকার যুবসমাজকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এরাই ছিলেন সমাজের কর্ণধার ও বুদ্ধিজীবী।
বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ১৬ অক্টোবর কধুরখীল গ্রামের প্রাচীন দুর্গাবাড়ির পাশে অবস্থিত প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন একটি টিলার ওপর এলাকার ১৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে একসারি দাঁড় করিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে। পরে মৃতদেহগুলো টিলার পাশের খাদে ফেলে দেওয়া হয়। একই পরিবারের তিনজনকেও সেদিন ধরে আনা হয়—নিরঞ্জন দাশগুপ্ত এবং তার দুই ছেলে চন্দন দাশগুপ্ত ও আশুতোষ দাশগুপ্ত (নন্দন)। আশুতোষ দাশগুপ্ত নন্দন তখন অষ্টম বা নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেলেও তার বাবা ও দাদা শহীদ হন।
কধুরখীল গ্রামের এ পর্যন্ত ৪৫ জন শহীদের নামে যেখানে তাদের হত্যা করা হয়, সেখানে স্মৃতিফলকে নাম লিপিবদ্ধ করে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। প্রায় এক দশক আগে স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষের উদ্যোগে তৎকালীন সাংসদ মঈন উদ্দিন খান বাদল এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলশাদ বেগমের প্রচেষ্টায় বধ্যভূমির স্মৃতি সংরক্ষণের কার্যক্রম শুরু হয়। তবে বর্তমানে স্মৃতিফলকটি অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে আছে।
যেখানে ১৯৭১ সালের ১৬ অক্টোবর একসঙ্গে ১৬ জনকে হত্যা করা হয়, সেই স্থানটির গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু আজ সেই গুরুত্ব অনেকটাই উপেক্ষিত। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে কধুরখীল বধ্যভূমি আজও দাঁড়িয়ে আছে।
স্মৃতিফলকে লিপিবদ্ধ শহীদদের মধ্যে রয়েছেন—প্রকৌশলী মোঃ রফিক উদ্দিন, মোঃ আবদুল হামিদ, মোঃ সৈয়দুল আলম, শান্তি পদ দেব, অধ্যাপক দিলিপ কুমার চৌধুরী, শিক্ষক অবিনাশ চন্দ্র শীল, মোঃ নুরুল সলাম, বাবুল কুমার দাশ, তেজেন্দ্র লাল মজুমদার, তারা চরণ দেওয়ানজী, বগলা চরণ দেওয়ানজী, প্রধান শিক্ষক বঙ্কিম চন্দ্র আইচ, রতন রঞ্জন মজুমদার, নিরঞ্জন দাশগুপ্ত, তিনকরি দাশগুপ্ত, সুধীর রঞ্জন চৌধুরীসহ মোট ৪৫ জন এবং আরও অনেক নাম না জানা শহীদ।
কধুরখীল বধ্যভূমি শুধু একটি স্থান নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভয়াবহতা ও বাঙালির আত্মত্যাগের এক জীবন্ত দলিল।