ঢাকা শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রাজবাড়ীতে কৃত্রিম পরাগায়নে পেঁয়াজবীজ চাষে নতুন সম্ভাবনা

রাজবাড়ীতে কৃত্রিম পরাগায়নে পেঁয়াজবীজ চাষে নতুন সম্ভাবনা

মৌমাছির অভাব ও প্রাকৃতিক পরাগায়নের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কৃত্রিম পদ্ধতিতে পেঁয়াজবীজ উৎপাদনে ঝুঁকছেন রাজবাড়ীর কৃষকেরা। বাড়তি শ্রম ও খরচ সত্ত্বেও অধিক ফলন ও লাভের আশায় এ পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

গোয়ালন্দ উপজেলার তোরাপ শেখ পাড়ার কৃষক হুমায়ন আহম্মেদ এ বছর নিজ এলাকায় ৪০ শতাংশ জমিতে পেঁয়াজবীজ চাষ করেছেন।

কয়েক দিন আগে তিনজন শ্রমিক নিয়ে তিনি আলতো করে হাতের স্পর্শে পেঁয়াজবীজের সঙ্গে কদমফুলের পরাগায়ন করেন। ভালো ফুল দেখে তিনি আশা করছেন, এবার ফলন ভালো হবে। তাঁর ধারণা, উৎপাদিত বীজ বিক্রি করে ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকা আয় করতে পারবেন।

হুমায়ন আহম্মেদ জানান, গত বছর ফরিদপুর সদর উপজেলার দুর্গাপুর এলাকায় চার বিঘা জমিতে পেঁয়াজবীজ চাষ করেছিলেন। মৌমাছির অভাবে তখনও হাতের মাধ্যমে পরাগায়ন করতে হয়েছিল। এতে বিঘাপ্রতি প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হলেও ফলন পেয়েছিলেন ১৬০ থেকে ১৭০ কেজি। গড়ে ৫ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি করে তিনি প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা পান। সব খরচ বাদ দিয়ে চার বিঘা জমিতে তাঁর লাভ হয় অন্তত ২৪ লাখ টাকা।

এ বছর দুর্গাপুরে সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে আবাদ বাড়ানোর পাশাপাশি নিজ এলাকায় ৪০ শতাংশ জমিতে ৬০০ কেজি উচ্চফলনশীল পেঁয়াজ বীজ রোপণ করেছেন তিনি। এতে প্রায় ২০০ কেজি বীজ পাওয়ার আশা করছেন। খুচরা বাজারে ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রির পাশাপাশি প্যাকেটজাত করে সরাসরি কৃষকের কাছে বিক্রির পরিকল্পনাও রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ৭ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি করলে মোট ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকা আয় হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

তবে প্রকৃতিনির্ভর পরাগায়নে ঝুঁকি থাকায় অনেক কৃষক ক্ষতির মুখেও পড়ছেন। হুমায়নের স্বজন আবদুল মালেক গত বছর এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজবীজ চাষ করে মৌমাছির ওপর নির্ভর করেছিলেন। ফলে তিনি মাত্র ২২ কেজি বীজ পান, যা বিক্রি করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা আয় হয়, খরচের তুলনায় যা লোকসান।

কৃষকদের ভাষ্য, নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে উপকারী পোকামাকড় ও মৌমাছির সংখ্যা কমে গেছে। এতে প্রাকৃতিক পরাগায়ন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষি বিভাগের পরামর্শে তাঁরা কৃত্রিম পদ্ধতিতে পরাগায়নের দিকে ঝুঁকছেন এবং এতে ভালো ফলও পাচ্ছেন। হাত দিয়ে পরাগায়নে সময় বেশি লাগে। তারপরও মৌমাছির অভাবে বাধ্য হয়ে এ পদ্ধতি গ্রহণ করছেন তাঁরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, রাজবাড়ীতে পেঁয়াজবীজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩০০ মেট্রিক টন। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল ৭১ মেট্রিক টন। চলতি বছর তা বেড়ে ৭২ মেট্রিক টনে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। জেলার সদর উপজেলায় ৪৬ হেক্টর, পাংশায় ৪৫, বালিয়াকান্দিতে ২৩, কালুখালীতে ২০ এবং গোয়ালন্দে ৭ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজবীজ চাষ হয়েছে। এ অঞ্চলে মুড়িকাটা ও হালি পেঁয়াজের আবাদ বেশি হয়।

চলতি মৌসুমে প্রায় ৩৩ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে হালি পেঁয়াজ চাষ হয়েছে, যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন। গত বছর ৩১ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন। লালতীর কিং, তাহেরপুরী, বারি-১ ও বারি-৪ জাতের বীজ এখানে বেশি আবাদ হয়।

সাধারণত নভেম্বরের মাঝামাঝি চাষাবাদ শুরু হয়ে মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত বীজ সংগ্রহ করা হয়।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, মুড়িকাটা বা হালি পেঁয়াজের আবাদ বেশি হওয়ায় বীজ উৎপাদনে তুলনামূলক কম আগ্রহ ছিল। তবে উৎপাদন বাড়াতে এ বছর প্রায় ২০০ জন কৃষককে মাঠপর্যায়ে সহযোগিতা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এ সংখ্যা আরও বাড়বে বলে তিনি জানান।

নতুন সম্ভাবনা,পেঁয়াজবীজ চাষ,কৃত্রিম পরাগায়ন,রাজবাড়ী
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত