
রংপুরের পীরগঞ্জ ও দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ, বিরামপুর এবং হাকিমপুর উপজেলার লাখো মানুষের স্বপ্নের জয়ন্তীপুর সেতু ৮ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। নির্ধারিত সময়ের আগেই এর নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানান জটিলতায় নির্মাণকাজ এখনও শেষ হয়নি। ফলে দুর্ভোগ কমছে না এলাকার প্রায় ৮ লাখ মানুষের। সেতু না থাকায় এখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করতোয়া নদী পার হচ্ছেন মানুষ।
শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাঁকো আর বর্ষায় ডিঙি নৌকাই একমাত্র ভরসা। ভারী মালামাল, অসুস্থ রোগী কিংবা জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে ঘুরতে হচ্ছে দীর্ঘ পথ। যেখানে সরাসরি দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার, সেখানে বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার।
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) থেকে জানা গেছে, করতোয়া নদীর ওপর জয়ন্তীপুর ঘাটে ২৯৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৯ দশমিক ৮ মিটার প্রস্থ ফুটপাতসহ সেতু নির্মাণে ২৯ কোটি ৪৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পীরগঞ্জ সীমানায় ৩৮৭ মিটার ও নবাবগঞ্জে ৪৫০ মিটার সংযোগ সড়কও রয়েছে।
বিভাগীয় শহর রংপুরের সাথে দিনাজপুর জেলার দক্ষিণের দুটি (নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর) উপজেলার যোগাযোগ সহজ করতে করতোয়া নদীতে রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার টুকুরিয়া ইউনিয়নের জয়ন্তীপুর ঘাটে ২০১৫ সালে ২৯৪ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয় সরকার।
নানা জটিলতার পরে ২০১৮ সালে সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পিপিএল। পরবর্তী সময়ে ঠিকাদার মৃত্যুবরণ করলে ২০২৩ সালে বন্ধ হয়ে যায় সেতুর নির্মাণ কাজ। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার পর পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর।
২০২৪ সালের মে মাসে পটুয়াখালী জেলার একে-এসবি-এমএ (জেভি) নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২২ কোটি ২৪ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৬ টাকা সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সেতু নির্মাণের কাজ পায়। সময় নির্ধারণ করা হয় ২০ মাস, সেই মোতাবেক ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সেতু নির্মাণের সময় শেষ হওয়ার কথা। অথচ তা আজও হয়নি।
সেতুর মাত্র ৬০/৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সংযোগ সড়কের কাজ এখনও শুরুই করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। মাত্র কয়েকজন শ্রমিক দিয়ে চলছে সেতুর বাকি থাকা গার্ডার শাটারিংয়ের কাজ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে নির্মাণ কাজ শেষ না হলে আবারও জনগণের দুর্ভোগ অব্যাহত থাকবে। দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের বাসিন্দা নুর ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর দ্বিতীয় দফায় কাজ শুরু হলেও সঠিক সময়ে কাজ শেষ হবে বলে মনে হয় না।
ব্যবসায়ী রহিদুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, এই ঘাট দিয়েই দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ ও হাকিমপুর উপজেলার সাথে পীরগঞ্জ হয়ে বিভাগীয় শহর রংপুরে যাতায়াত করি। ফলে দূরত্ব কম হওয়ার কারণে সময় অনেক কম লাগে। কাজের বিলম্বে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
পীরগঞ্জ উপজেলার জয়ন্তীপুর, তরফমৌজা গ্রামের আতোয়ার ও মিজানুরসহ কয়েকজন এলাকাবাসী জানান, সঠিক তদারকি না থাকায় কাজের মান নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজের গতি বাড়ানোর কোনো চেষ্টাই চোখে পড়ছে না।
প্রকল্পের ঠিকাদারি সংস্থার একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইতিমধ্যে সেতুর ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আর ৫টি গার্ডার ও দুটি স্ল্যাব ঢালাইয়ের কাজ বাকি আছে। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় সংযোগ সড়কের কাজ বন্ধ আছে।
তিনি আরও বলেন, “যদিও কিছুটা দেরি হয়েছে, আমরা এখন অতিরিক্ত শ্রমিক দিয়ে চেষ্টা করছি। আশা করছি নির্ধারিত সময়েই কাজ শেষ করা হবে।”
পীরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) আসাদুজ্জামান বাপ্পী গণমাধ্যমকে জানান, পীরগঞ্জ অংশের ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হলেও দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ অংশের সংযোগ সড়কের ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। মূল সেতু নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের দিকে।