
একসময় প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যাওয়া তিল ফসল এখন আবার উঠে এসেছে কৃষকদের আগ্রহের কেন্দ্রে। কম খরচে উৎপাদন করে বাজারে ভালো দামে বিক্রি করতে পেরে তিল চাষে কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। এছাড়া ভোজ্য তেল হিসেবেও তিলের তেলের চাহিদা বেড়েছে। ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণ ও আমদানিনির্ভরতা কমাতে পাবনার ঈশ্বরদীতে বাড়ছে তিলের আবাদ।
উচ্চ ফলনশীল জাতের ব্যবহার, সরকারি প্রণোদনা এবং ভোজ্য তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রসারিত হচ্ছে তিল চাষ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, ২০২৬-২৭ মৌসুমে ঈশ্বরদী উপজেলায় মোট তিল আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০০ হেক্টর জমিতে। এ বছর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে ৪০০ হেক্টর জমিতে তিলের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জমিতে তিলের চাষ হয়েছে উপজেলার লক্ষ্মীকুন্ডা ইউনিয়ন ও সাঁড়া ইউনিয়নের চরাঞ্চলসহ সমতল জমিতে।
সরেজমিনে বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা আমন ধান আবাদের পর তিল চাষ করেন। তিল চাষে সার ও কীটনাশক লাগে না বললেই চলে। গরু-ছাগল তিল খায় না, তাই রক্ষণাবেক্ষণেও তেমন কোনো খরচ হয় না।
এখানকার কৃষকদের ভাষ্য, দেশি জাতের তিলে ফলন ও লাভ কম হওয়ায় একসময় অনেকেই এ ফসলের আবাদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন এবং কৃষি বিভাগের সহায়তায় আবারও তিল চাষে আগ্রহ বেড়েছে। চলতি মৌসুমে খরিপ-১, টি-৬ ও বারি তিল-৪ জাতের তিলের আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর ফলন ও দাম ভালো থাকায় কৃষকদের মুখে ফুটে উঠেছে হাসি।
উপজেলার লক্ষ্মীকুন্ডা গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম জানান, তিল থেকে পাওয়া যায় ভোজ্য তেল ও খৈল। এ ফসলে রোগবালাই কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও তুলনামূলক কম। তার ভাষ্য, এ বছর তিল ও সরিষার ভালো ফলন হয়েছে। বাজারে দামও ভালো রয়েছে। এতে পরিবারের সারা বছরের তেলের চাহিদা পূরণ হয়ে উদ্বৃত্ত তিল বাজারে বিক্রি করে নগদ টাকাও পাবেন তিনি, যা দিয়ে সংসারের অন্যান্য খরচ মেটাতে পারবেন।
একই উপজেলার সাঁড়া ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের কৃষক জার্মান আলী বলেন, কৃষি কর্মকর্তাদের উৎসাহ ও প্রণোদনা পেয়ে পদ্মা নদীর জেগে ওঠা চরে ৩০ শতক জমিতে তিল চাষ করেছেন তিনি। বিঘাপ্রতি বীজ ও সার সহায়তা পাওয়ায় চাষে উৎসাহ বেড়েছে।
উপজেলার সাঁড়া ইউনিয়নের মোল্লাচরে তিল আবাদ করেছেন মিজানুর রহমান নামে এক কৃষক। তিনি জানান, তিল চাষে জমির উর্বর শক্তি বাড়ে। রাসায়নিক সার ও জমি নিড়ানির দরকার হয় না। সামান্য শ্রম ও অল্প খরচে প্রতি বিঘায় ৫ থেকে ৬ মণ ফলন মেলে। এ বছর ফলন ভালো হওয়ায় আগামী মৌসুমে তিল আবাদে আগ্রহী হচ্ছেন অন্য কৃষকরাও।
কৃষক জাবেদ আলী বলেন, কৃষি বিভাগের উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ভালো ফলন হয়েছে। কৃষকদের জন্য সরকারি প্রণোদনা আরও বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
উপজেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, তিল শুধু লাভজনক ফসলই নয়, এটি মাটির উর্বরতাও বৃদ্ধি করে। তিল গাছের পাতা পচে সবুজ সারের কাজ করে, ফলে জমির জৈবগুণ বাড়ে। একই জমিতে কয়েক বছর তিল চাষ করলে রাসায়নিক সারের প্রয়োজনও কমে যায়।
তারা জানান, দো-আঁশ ও অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে তিল ভালো জন্মে এবং সঠিক পরিচর্যা করলে প্রতি হেক্টরে দেড় মেট্রিক টনের বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর উপজেলায় তিল আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০০ হেক্টর জমিতে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহায়তায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে আবাদ হয়েছে ৪০০ হেক্টর জমিতে। ২৫০ জন কৃষককে তিল আবাদের জন্য প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মমিন বলেন, ভোজ্য তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সরিষার পাশাপাশি তিলের আবাদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিল থেকে উৎপাদিত তেল স্বাস্থ্যসম্মত।
তিনি জানান, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও নিয়মিত তদারকির কারণে এ বছর তিলের আবাদ বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ফলনও হয়েছে সন্তোষজনক।