
দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট ও নেতৃত্বের শূন্যতা নিরসনে দ্রুত সব শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ এবং সহকারী প্রধান শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, সুপার ও সহকারী সুপারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানানো হয়েছে।
বুধবার বিকেলে নোয়াখালীতে কুরআনিক সাইন্স মাদ্রাসা আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান উত্তর ওয়াসেকপুর বালিকা দাখিল মাদ্রাসার সহকারী সুপারিন্টেন্ডেন্ট ও শিক্ষক হাফিজুর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে হাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশের অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সুপার ও সহকারী সুপারসহ বিভিন্ন পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। দীর্ঘসূত্রতা ও জটিল নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে যথাসময়ে এসব পদ পূরণ না হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের শূন্যতা ও শিক্ষক সংকট নিরসনে ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত পুনর্বিবেচনা করে বাস্তবসম্মত অভিজ্ঞতার শর্ত নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একজন যোগ্য শিক্ষককে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে আসতে দীর্ঘ ১৮ বছর অপেক্ষা করতে হলে যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব তৈরির পথ সংকুচিত হয়ে যায়।
হাফিজুর রহমানের দাবি, এমপি, মন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এ ধরনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বাধ্যতামূলক শর্ত নেই। অথচ শিক্ষকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশায় প্রতিষ্ঠানপ্রধান বা নেতৃত্বের পদে যাওয়ার ক্ষেত্রে পূর্বের ১০ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত পরিবর্তন করে ১৮ বছর করা হয়েছে। যোগ্যতা, মেধা, নেতৃত্বের দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে এ শর্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতা দূর করে পিএসসি বা এনটিআরসিএর মাধ্যমে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
হাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে শিক্ষক নিবন্ধন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে একদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শূন্যপদ বাড়তে থাকে, অন্যদিকে যোগ্য নিবন্ধনধারীরাও দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকেন। তাই সময়সীমাবদ্ধ ও দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করে অল্প সময়ের মধ্যে সব শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের বায়োমেট্রিক ডিজিটাল হাজিরা নিশ্চিত করা এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি জোরদার করার দাবিও জানান তিনি।
তিনি বলেন, শুধু শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই হবে না। জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শিক্ষক শূন্যপদ এবং সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম তদারকির আওতায় আনতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের নোট-গাইডনির্ভরতা থেকে বের করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নির্ধারিত মূল পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
হাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর ও গাইডনির্ভর শিক্ষা থেকে বের করে পাঠ্যবইকেন্দ্রিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নির্ধারিত পাঠ্যবই অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, নৈতিকতা, দক্ষতা ও কর্মমুখী যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষা জাতির বোঝা নয়; বরং স্বাধীনতার দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন, যার বাস্তব প্রতিফলন শিক্ষার্থীদের চরিত্র, কর্মদক্ষতা, নৈতিকতা ও দেশ গঠনের কাজে দেখা যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার ও শিক্ষক সমাজের বিভিন্ন দাবি নিয়ে ৩৫টি সংস্কার প্রস্তাবনা এবং প্রায় ১৮৬ পৃষ্ঠার একটি নীতিগত প্রস্তাবনা প্রস্তুত করা হয়েছে। এতে শিক্ষক সংকট, নেতৃত্বের শূন্যতা, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, বেতন, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও শিক্ষা সংস্কারের বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
হাফিজুর রহমান বলেন, প্রায় ৮২ হাজার শিক্ষক পদের শূন্যতা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা মূল্যায়ন করে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন।
তিনি প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং জাতীয় সংসদের ৩৫০ জন আইনপ্রণেতার কাছে এসব দাবি ও শিক্ষা সংস্কার প্রস্তাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান। এ বিষয়ে তিনি লিখিত আবেদন ডাকযোগে প্রেরণ করেছেন বলেও জানান।
তার প্রধান দাবিগুলো হলো—
১. ১৮ বছরের অভিজ্ঞতার শর্ত পুনর্বিবেচনা করে বাস্তবসম্মত শর্ত নির্ধারণ।
২. শিক্ষক সংকট ও নেতৃত্বের শূন্যতা নিরসনে দ্রুত সব শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ।
৩. এনটিআরসিএর নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে সময়সীমাবদ্ধ ও দ্রুত নিয়োগ ব্যবস্থা চালু।
৪. মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়ন।
৫. সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বায়োমেট্রিক ডিজিটাল হাজিরা নিশ্চিত করা।
৬. জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা।
৭. নোট-গাইডনির্ভরতা বন্ধ করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নির্ধারিত মূল পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।হাফিজুর রহমান বলেন, শিক্ষকতা পেশাকে মর্যাদাপূর্ণ ও আকর্ষণীয় করতে হলে মেধাবীদের শিক্ষকতায় নিয়ে আসার পাশাপাশি যোগ্য শিক্ষককে যথাযথ মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও নেতৃত্বের সুযোগ দিতে হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিক্ষা সংস্কারের এসব দাবি ও প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করে সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবান্ধব একটি আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।