
রংপুরের মিঠাপুকুরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা ডাম্প ট্রাকের পেছনে যাত্রীবাহী কোচের ধাক্কায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে চারজনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় তিন নারীসহ অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। আহতদের উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোর ৫টার দিকে মিঠাপুকুর উপজেলার বৈরাগীগঞ্জ এলাকায় মহাসড়কের পাশে মাজার মসজিদের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার আলমগীর হোসেন (৪৫), মোজাফফর হোসেন, তার বোন গোলাপী বেগম এবং কোচের হেলপার আপেল মিয়া। তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয় ঘটনাস্থলে। অন্য তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
বড়দরগা হাইওয়ে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফজরের নামাজের পর বৈরাগীগঞ্জ শাহ আমানত পেট্রল পাম্পের বিপরীত দিকে মাজার মসজিদের সামনে মাটিবোঝাই একটি ডাম্প ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীগামী ‘খান এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি যাত্রীবাহী কোচ দ্রুতগতিতে এসে ট্রাকটির পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে কোচটির সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে যায় এবং বেশ কয়েকজন যাত্রী গুরুতর আহত হন।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার অভিযান চালান। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনায় জড়িত কোচটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-ব-১৩১৯২৫ এবং ডাম্প ট্রাকটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-ট-১৩৬৬২৮ বলে জানা গেছে।
বড়দরগা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম উদ্দিন দুর্ঘটনায় চারজন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘটনাস্থলে একজন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক সরদার আব্দুল জলিল জানান, বৈরাগীগঞ্জে বাস-ট্রাকের সংঘর্ষে নিহত চারজনের মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। পরিচয় শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. গোপাল চন্দ্র বর্মন জানান, দুর্ঘটনায় আহত একাধিক ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের অনেকের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত রয়েছে। আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। তাঁদের চিকিৎসা চলছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত ব্যক্তিরা
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে রয়েছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাটের দুর্গাচরণ এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলে নজরুল ইসলাম (৩৬), কুঠিপাড়া গ্রামের লিপি বেগম (৫০), ফুলবাড়ী উপজেলার চন্দ্রখানা গ্রামের জহুর উদ্দিনের ছেলে শহিদুল ইসলাম (৪৭) ও আয়েশা খাতুন (৭)।
এ ছাড়া কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হাজীপাড়া গ্রামের দুলালী বেগম (৪৪), রংপুরের পীরগাছা উপজেলার পূর্ব হাগুলিয়া গ্রামের বুলবুলি বেগম শাহীনা (৪০), লালমনিরহাটের পূর্ব আমবাড়ি গ্রামের ফারুক হোসেন (৩২), কুড়িগ্রামের উলিপুরের মহাদেব এলাকার রাকিবুল ইসলাম আপেল (২২) এবং লালমনিরহাটের বড়বাড়ি এলাকার ফারুক (৩০) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মহাসড়কে যত্রতত্র পার্কিং নিয়ে ক্ষোভ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ছয় লেনের অংশে বিভিন্ন স্থানে ট্রাকসহ ভারী যানবাহন দাঁড় করিয়ে রাখার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। তাঁদের দাবি, মহাসড়কে অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।
বড়দরগা হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, সীমিত জনবল নিয়ে মহাসড়কে নির্ধারিত স্থানের বাইরে যানবাহন পার্কিং বন্ধে পুলিশ কাজ করছে। অনেক সময় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে যানবাহন সড়কে দাঁড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড রাখার নিয়ম থাকলেও অনেকে তা মানেন না।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো এবং চালকের ঘুম ঘুম ভাব থেকেও এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। মহাসড়কে নিরাপদে যান চলাচল নিশ্চিত করতে চালকদের সতর্ক থাকা এবং নিয়ম মেনে গাড়ি চালানো জরুরি।
হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল আমিনও দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। আহতদের উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠানো হয়েছে। দুর্ঘটনার পর বর্তমানে মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, দুর্ঘটনায় তিনজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন এবং আহত ১৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।