ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ইনানীতে গ্যাসের আগুন নেভানো হচ্ছে না কেন?

ইনানীতে গ্যাসের আগুন নেভানো হচ্ছে না কেন?

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের আগুন আট দিন ধরে জ্বলছে। আগুন নেভানোর পরিবর্তে আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) ও পেট্রোবাংলা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাসের প্রবাহ, আগুনের শিখা ও ভূতাত্ত্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

১৫ দিনের পর্যবেক্ষণে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ করতে রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে গ্যাসের প্রকৃত উৎস, রাসায়নিক গঠন ও মজুতের পরিমাণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

স্থানীয়ভাবে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বেরিয়ে আসার পর আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর থেকে আগুন জ্বলছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আগুনের উৎসস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে প্রবেশ ও অবস্থানে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারাও জারি করেছে। আগুনের কারণে ইনানী ছোটখাল ও শফিবিল এলাকার প্রায় ৪০০ পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আগুন নেভানোর বদলে পর্যবেক্ষণ কেন?

বাপেক্সের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈজ্ঞানিকভাবে গ্যাসের আগুন পর্যবেক্ষণে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গ্যাসের প্রবাহ অব্যাহত থাকলে রিলিফ কূপ খনন করে ভূগর্ভে সিমেন্ট পাম্প করার মাধ্যমে প্রবাহ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে শিলা ও পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে আগুন ও অতিরিক্ত তাপের কারণে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। খননস্থল ছাড়াও আশপাশের কয়েকটি জায়গা থেকে গ্যাস বের হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

বাপেক্সের সহকারী ব্যবস্থাপক ইমাম-উল ইসলাম রোকন বলেন, ঘটনাস্থলে গ্যাস শনাক্ত করার যন্ত্র নেওয়া হয়েছিল। তবে আগুনের কারণে মূল উৎসস্থলে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। আশপাশের অন্যান্য স্থানেও গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়নি। আগুনের কাছাকাছি ২০ থেকে ২৫ ফুট দূরেও প্রচণ্ড তাপ অনুভূত হচ্ছে।

বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুক্তাদির বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। তবে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব জানান, বিষয়টি নিয়ে অভিজ্ঞ ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া গ্যাসের সুনির্দিষ্ট ধরন বা এর সঙ্গে তেল কিংবা কনডেনসেট রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, আগুনের শিখা বাড়ছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাই গ্যাসের প্রবাহ ও আগুনের উচ্চতা পর্যবেক্ষণে রেখে ১৫ দিন পর পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে। আগুনের তীব্রতা একই রকম থাকলে বা বাড়তে থাকলে রিলিফ কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। আর গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে এলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, ভূগর্ভের অপেক্ষাকৃত অগভীর কোনো স্তর থেকে গ্যাস বের হচ্ছে। সাধারণত বাংলাদেশে দেড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গভীরতায় গ্যাসের মজুত পাওয়া যায়। ইনানীর এই গ্যাসের প্রকৃতি ও উৎস নির্ধারণে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। সম্ভাব্য মজুতের পরিমাণ এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য কি না, তা-ও এখনো নিশ্চিত নয়।

গ্যাসের সঙ্গে তেল থাকার সম্ভাবনা কতটা?

প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম একই হাইড্রোকার্বন ব্যবস্থার অংশ হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্যাসের সঙ্গে তরল হাইড্রোকার্বন বা কনডেনসেটও থাকতে পারে। তবে ইনানীতে এমন কিছু রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে নমুনা পরীক্ষা ও ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান প্রয়োজন।

পেট্রোবাংলার পরিচালক মো. শোয়েব জানান, সম্ভাব্য গ্যাসের মজুত সম্পর্কে ধারণা পেতে ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের পরিকল্পনা রয়েছে। অনুসন্ধানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হলে নতুন কূপ খননের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

তবে আগুনের রং বা শিখার বৈশিষ্ট্য দেখে গ্যাসের রাসায়নিক গঠন, তেল বা কনডেনসেটের উপস্থিতি কিংবা মজুতের পরিমাণ নিশ্চিত করা যায় না। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য পরীক্ষাগার বিশ্লেষণ ও ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান জরুরি।

জননিরাপত্তায় প্রশাসনের তৎপরতা

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পাশাপাশি উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তার এবং উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদারও একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, বিষয়টি কারিগরি ও গবেষণাসংশ্লিষ্ট। বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার পরামর্শ অনুযায়ী প্রশাসন পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে। এ ক্ষেত্রে আপাতত জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইউএনও পান্না আক্তার জানান, ঘটনার শুরু থেকেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ইনানী দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা হওয়ায় সম্ভাব্য গ্যাসের মজুত ও ভবিষ্যৎ অনুসন্ধান নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস বা তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা নির্ধারণের আগে মজুতের পরিমাণ, উত্তোলন ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব ও নিরাপত্তাঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে।

আপাতত আগুনের উৎস ও গ্যাসের প্রকৃতি নির্ধারণের পাশাপাশি নিরাপদে গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করাই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ। ১৫ দিনের পর্যবেক্ষণে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তার ওপরই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করছে।

গ্যাসের আগুন,ইনানী,নেভানো হচ্ছে না
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত