অনলাইন সংস্করণ
২০:০৫, ০৭ মার্চ, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে বড় ধরনের হামলার এক সপ্তাহ পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণও এখনো দেখা যাচ্ছে না।
এই সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলায়। এর ফলে আরব উপসাগরে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল বহনকারী জাহাজ আটকে পড়েছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে উপসাগরের প্রবেশপথ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না। এই প্রণালীর উত্তর পাশে রয়েছে ইরান।
মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে।
শুক্রবার তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ৯০ দশমিক ৯০ ডলারে লেনদেন শেষ হয়েছে, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেশি। আর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড তেল সপ্তাহজুড়ে ২৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২ দশমিক ৬৯ ডলারে।
তেলের দাম বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যে জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। পেট্রল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্ট অঙ্গরাজ্যের মিডলবেরিতে জ্বালানি নিতে গিয়ে এক গ্রাহক মার্ক ডোরান বলেন, “এটা পাগলামি। এমন সময় এটা প্রয়োজন ছিল না, যখন মানুষ আগেই সংগ্রাম করছে। তবে এই অস্থিরতার মধ্যে এটা অপ্রত্যাশিতও নয়।”
তিনি আরও বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র শুরু করা কোনো সংঘাতের দ্রুত সমাপ্তি হয়েছে—এমনটা আমি দেখিনি। তাই তারা দ্রুত শেষ হবে বললেও সেটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলতে পারে, তবে প্রয়োজন হলে আরও দীর্ঘ সময় চালানোর সক্ষমতা রয়েছে। শুক্রবার তিনি বলেন, ইরানের “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” ছাড়া কোনো আলোচনার সম্ভাবনা নেই।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনভেরাসের ম্যাক্রো অয়েল ও গ্যাস গবেষণা বিভাগের প্রধান আল সালাজার বলেন, “যত বেশি খবর আসছে, ততই মনে হচ্ছে এই সংঘাত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।”
যুক্তরাষ্ট্রে শুক্রবার সাধারণ পেট্রলের দাম বেড়ে প্রতি গ্যালন ৩ দশমিক ৩২ ডলারে পৌঁছেছে, যা এক সপ্তাহে ১১ শতাংশ বেশি। ডিজেলের দাম দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩৩ ডলার, যা ১৫ শতাংশ বেশি, জানিয়েছে আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন।
তবে ইউরোপ ও এশিয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় ইউরোপে ডিজেলের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে এবং এশিয়ায় জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, জানিয়েছে জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান রিস্তাদ এনার্জি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন তেল স্থাপনা, রিফাইনারি ও পাইপলাইনে হামলার কারণে প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারের বাইরে চলে গেছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক বাণিজ্য সচল রাখতে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতির বিমা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে অনেক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, অতিরিক্ত বিমা সুবিধা দিলেও মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অ্যামি জাফে বলেন, “তেল পরিবহন খাতে এখন বড় উদ্বেগ হলো সন্ত্রাসবিরোধী নিরাপত্তা—ড্রোন, মাইন বা দ্রুতগতির নৌকা দিয়ে হামলার ঝুঁকি।”
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে।