
আল্লাহতায়ালা তোমার ওপর যে বড় বড় নিয়ামত দান করেন, তার মধ্যে একটি হলো রমজানের শেষ দশ দিন পাওয়া। কোরআন-হাদিসে এই দিনগুলোর অনেক বড় ফজিলত ও মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। এগুলো এমন রাত, যেগুলোকে মহান আল্লাহ লাইলাতুল কদরের মাধ্যমে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। এর মর্যাদা ও ফজিলত অনেক বড়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রাতে; আর মহিমান্বিত রাত সম্বন্ধে তুমি কী জান? মহিমান্বিত রাত সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ (সুরা কদর : ১-৩)।
এই কারণে আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সা.) রমজানের শেষ দশকে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি ইবাদতে পরিশ্রম করতেন। রমজানের শেষ দশ দিন শুরু হলে তিনি রাত জেগে ইবাদত করতেন, পরিবারের সদস্যদেরও জাগিয়ে দিতেন এবং ইবাদতে বেশি মনোযোগ দিতেন। হাদিসে এসেছে, ‘যখন রমজানের শেষ দশ দিন শুরু হতো, তখন তিনি রাত জেগে ইবাদত করতেন, নিজের পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন, আরও বেশি চেষ্টা করতেন ও কোমর বেঁধে ইবাদতে মনোযোগ দিতেন।’ (মুসলিম : ২৬৭৭)।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের শেষ দশ রাতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।’ (বোখারি : ২০২০)।
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর খোঁজো।’ (বোখারি : ২০১৭)।
মহানবী (সা.) এই দশ দিনে ইতিকাফ করতেন, লাইলাতুল কদর পাওয়ার আশায়। তাই হে মানুষ! এই সময়কে গনিমত মনে করো। এগুলো সফলতা ও কল্যাণ লাভের বিশেষ সুযোগ। এমন উত্তম সময় খুবই সীমিত। তাই রমজানের বাকি সময়টুকু কাজে লাগাও, বেশি বেশি ভালো কাজ ও নেক আমল করার চেষ্টা করো। যে তার হিদায়াতের আলো গ্রহণ করে, তিনি তাকে পথ দেখান। যে তার দিকে ফিরে আসে, তিনি তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। যে তার দরজায় আশ্রয় নেয়, তিনি তাকে আশ্রয় দেন। আর যে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাকেও তিনি ডাক দেন। তাই বেশি বেশি নেক কাজ করার চেষ্টা করো, ভালো কাজের দিকে প্রতিযোগিতা করো এবং আসমান-জমিনের রবের কাছে তওবা করো। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করে, তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বোখারি : ১৯০১)।
হে মুসলিম ভাই! তুমি নেককার ও মুত্তাকিদের সঙ্গে ভালো কাজের প্রতিযোগিতায় অংশ নাও। এই সময় নেককারদের ব্যবসার বাজার, আখিরাতের দিনের জন্য তাকওয়ার খেত এবং সেই সফরের জন্য পাথেয় সংগ্রহের স্থান- যে সফর অন্য কোনো সফরের মতো নয়। অতএব আফসোস সেই মানুষের জন্য, যে গাফেল থেকে যায় এবং এই মহান সুযোগগুলো নষ্ট করে ফেলে। একদিন মহানবী (সা.) মিম্বরে উঠে ‘আমিন’ বললেন।
সাহাবিরা কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, জিবরাইল (আ.) এসে বললেন, ‘ধ্বংস হোক সেই ব্যক্তির, যে রমজান পেল কিন্তু তবুও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’ তখন আমাকে বলা হলো, ‘আপনি আমিন বলুন।’ আমি বললাম, ‘আমিন।’ নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘রমজান মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। যে ব্যক্তি এই রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে যেন সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো।’ আর এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয় শুধু প্রকৃত বঞ্চিত মানুষ। তাই হে উচ্চ মনোবলের মানুষ! এই রাতগুলোর অসংখ্য ফজিলত ও মহান নিয়ামত লাভের চেষ্টা করো। কারণ যে ব্যক্তি তার লক্ষ্য জানে, তার জন্য কষ্ট সহ্য করা সহজ হয়ে যায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা ধাবমান হও স্বীয় প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে আর সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও জমিনের ন্যায়, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্যে।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৩৩)।
হে আল্লাহ, আমাদের তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা লাইলাতুল কদর পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করে এবং মহান সওয়াব অর্জন করে। সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
রমজান হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও ইবাদতের মাস। তাই মানুষ যেন মোবাইল ও যোগাযোগের যন্ত্রে ব্যস্ত হয়ে নামাজ-রোজার উদ্দেশ্য নষ্ট না করে। বিশেষ করে ইবাদতের স্থানে এভাবে ব্যস্ত থাকা শরিয়ত অনুযায়ী নিন্দনীয়। কারণ মসজিদ তৈরি করা হয়েছে নামাজ, আল্লাহর জিকির এবং কোরআন তিলাওয়াতের জন্য। তাই আল্লাহকে ভয় করো। কারণ এসব জিনিসে ব্যস্ত থাকা ইবাদতের বড় উদ্দেশ্য থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এটাই আল্লাহর বিধান এবং কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে সম্মান করলে এটা তো তার হৃদয়ের তাক্ওয়া-সঞ্জাত।’ (সুরা হজ : ৩২)।
আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘সে সব গৃহে যাকে সমুন্নত করতে এবং যাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে।’ (সুরা নুর : ৩৬)।
(১৭-০৯-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ০৬-০৩-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস- আবদুল কাইয়ুম শেখ)