
দাসির চিকিৎসায় চিকিৎসকদের অক্ষমতা বাদশাহর সামনে প্রকাশ হয়ে পড়া, বাদশাহর আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া এবং স্বপ্নে একজন অলির সাক্ষাৎ লাভ-
শাহ চো এজ্যে আন হাকিমান রা বেদিদ দ
পা বেরেহ্নে জানেবে মাসজিদ দওয়িদ
৫৫. বাদশাহ যখন ডাক্তারদের অক্ষমতা দেখতে পেলেন
(ভয়ে বিচলিত) নাঙ্গা পায়ে মসজিদের পানে দৌড়ে গেলেন।
রাফ্ত দার মাসজিদ সুয়ে মেহরাব শুদ
সাজ্দেগাহ্ আয্ আশ্কে শাহ্ পুর আব শুদ
৫৬. মসজিদে সোজা মেহরাবের পানে ছুটে গেলেন
বাদশাহর অশ্রুতে সিজদার জায়গা ভিজে গেল।
চোন বেখিশ্ আমাদ যে গ¦ারক্বাবে ফানা
খোশ যাবান বুগশাদ দার মদ্হ্ ও সানা’
৫৭. ফানার ঘূর্ণাবর্ত থেকে যখন প্রকৃতিস্থ হলেন,
আল্লাহ্র গুণগান প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন।
আবেদন-নিবেদন, কাকুতি-মিনতি করে বলতে লাগলেন-
কায় কমিনা বাখশেশাত্ মুল্কে জাহান
মন্ চে গুয়াম্ চোন্ তো মি দানি নেহান
৫৮. ওহে যার ন্যূনতম দান, দুনিয়ার এই রাজত্ব
আমি কী বলব, তুমি তো মনের গোপন কথা সবই জ্ঞাত।
আল্লাহর কাছে কীভাবে দোয়া করলে দোয় কবূল হবে তার নিয়ম বাৎলানো হয়েছে এখানে। অর্থাৎ আল্লাহ্র দরবারে রোনাজারিই আল্লাহ্র রহমত ও সাহায্য লাভের অমোঘ পন্থা।
এই হামীশে হাজতে মারা পানাহ্
বারে দীগার মা গালাত্ কারদীম রাহ
৫৯. ওহে! আমার সকল সময়ের সব অভাবের আশ্রয় তুমি,
আবারো তো পথ চিনতে ভুল করে ফেলেছি আমি।
আমি ধারণা করেছিলাম, চিকিৎসকরাই আমার দাসীকে আরোগ্য দান করতে পারবেন। এখন আমি বুঝতে পেরেছি, তারা নয়; বরং তুমিই তা পার। তুমি আমার শেষ আশ্রয়, তুমিই আমাকে উদ্ধার কর। আমার মনের সকল কথা, সব প্রয়োজন তোমার জানা। আমি না বললে, না চাইলেও তুমি পূরণ করতে পার। কিন্তু না। তোমার বিধান যে অন্য রকম? বান্দার যে চাইতে হবে।
লে-কে গুফতী গারচে মী দানাম সিরাত্
যূদ হাম পায়দা কুনাশ্ বার যাহেরাত
৬০. কিন্তু যে বলেছ, আমি যদিও তোমার ভেদের কথা সবই জানি
(তবুও) জলদি তা খুলে বল আমার কাছে (আমি যেন শুনি)।
এ বয়েতের প্রতিপাদ্য আয়াত ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা মুমিনুন : ৪০)।
উক্ত স্বগতোক্তি করে বাদশাহ আর্তকান্নায় ভেঙে পড়লেন। আর-
চোন বার আওরাদ আয মিয়ানে জান খুরুশ
আন্দার আমাদ বাহরে বখ্শায়েশ বে জুশ
৬১. হৃদয় মথিত কান্না যখন বক্ষ ফেটে উথলে উঠল
রহমতের দরিয়ায় ক্ষমা ও দয়ার জোয়ার আরম্ভ হলো।
দারমিয়ানে র্গেয়ে খাবাশ্ দার রোবুদ
দীদ দার খাব উ-কে পীরী রো নমুদ
৬২. কান্নার মাঝে তলিয়ে গেলেন অঘোরে ঘুমের কোলে
এমন সময় স্বপ্নে দেখেন যে, এক বৃদ্ধ তার সম্মুখে।
গোফত এই শাহ্ মুঝদা হাজাতাত্ রাওয়াস্ত
গার গারীবী আয়াদাত্ ফারদা যে মাস্ত
৬৩. বললেন, ওহে বাদশাহ, সুসংবাদ, পূরণ হয়েছে আপনার মকসূদ,
কাল কোনো আগন্তুক আসলে জানবেন, তিনি আমার দূত।
চোনকে আয়াদ উ হাকীমে হাযেকাস্ত
সাদেকাশ দান কূ আমীন ও সাদেকাস্ত
৬৪. যখন তিনি আসবেন (মনে রাখবেন) তিনি দক্ষ হেকিম
তাকে বিশ্বাস করবেন, কারণ তিনি বিশ্বস্ত ও সত্যনিষ্ঠ।
দার এলাজাশ্ সেহ্রে মুতলাক রা বেবীন
দার মেযাজাশ কুদরতে হাক রা বেবীন
৬৫. তার চিকিৎসায় জাদুুর কারিশমা দেখতে পাবেন
তার দেয়া মিকশ্চারে আল্লাহর কুদরতি শক্তি দেখবেন।
খোফ্তে বুদ ঈন খাব দীদ আগাহ শুদ
গাশ্তে মামলূকে কানীযাক শাহ শুদ
ক.ম. ঘুমন্ত ছিলেন তিনি এ স্বপ্ন দেখে সজাগ হলেন
দাসীর দাস হতে যাচ্ছিলেন, এখন বাদশাহ হলেন।
প্রকৃত অলি-আল্লাহর পরিচয়
স্বপ্ন দেখে বাদশাহর ঘুম ভেঙে গেল। বাদশাহ স্বপ্ন আর জাগরণের মাঝে অপেক্ষায় রইলেন কখন ভোর হবে আর স্বপ্নে পাওয়া হেকিমের আগমন হবে, তার অধীর আগ্রহে।
চোন রাসীদ আন ওয়াদেগাহ্ ও রূয শুদ
আফতাব আয্ শারক্ব আখতার সুয শুদ
৬৬. ঐ প্রতিশ্রুত সময় যখন আসল এবং দিবস হলো
পূর্বাচলের সূর্যের আলো নক্ষত্ররাজি জ্বালিয়ে দিল।
বুদ আন্দার মানজারাহ শাহ মোন্তাযির
তা বেবীনাদ্ আনচে বেনামুদান্দ সির
৬৭. মনযরায় বসে বাদশাহ অপেক্ষায় ছিলেন
যাতে স্বপ্নে দেখানো রহস্য বাস্তব চক্ষে দেখেন।
দীদ শাখ্সী ফাযেলী পুর মায়েয়ী
আফতাবী দারমিয়ানে সায়েয়ী
৬৮. দেখলেন সৌম্য মূর্তির এক প্রাজ্ঞ কামিল পুরুষ
ছায়ার মাঝ দিয়ে যেন আসছে কোনো সূর্য আলোক।
মী রাসীদ আয দূর মানান্দে হেলাল
নীস্ত বুদ ও হাস্ত বার শেক্লে খেয়াল
৬৯. আসছিলেন সেই দূর হতে, চাঁদনির আকৃতিতে
মনে হচ্ছিল এই দেখি এই নাই কল্পনার ছবিতে।
‘কল্পনার ছবিতে’ মূল ফারসিতে খেয়াল- এর শেকল। শেকল মানে আকৃতি। মওলানা রুমি (রহ.) এখন কাহিনির বর্ণনায় যাত্রা বিরতি দিয়ে চলে যেতে চান দর্শনের আকাশে। খেয়াল বা কল্পনা শব্দটি তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে ভাব ও দর্শনের জটিল জগতে। মানুষ বলতেই কল্পনা আছে। কিন্তু কল্পনার শক্তি-ব্যাপ্তি সম্পর্কে আমরা কয়জন জানি? স্বয়ং দার্শনিকরাও কল্পনার ঘূর্ণাবর্তে দিশেহারা। মওলানা তার স্বরূপ বিশ্লেষণ করছেন :
নীস্তওয়াশ বাশাদ খেয়াল আন্দার রাওয়ান
তো জাহানী বার খেয়ালি বীন রাওয়ান
৭০. মনের গহিনে কল্পনা ‘নাই’ এর মতই
(অথচ) তুমি দেখছ যে, জগত চলমান কল্পনার ওপরই।
বার খেয়ালি সুলহেশান ও জাঙ্গেশান
ওয়ায্ খেয়ালি ফাখরেশান ও নাঙ্গেশান
৭১. কল্পনার ওপরই (নির্ভরশীল) মানুষের যুদ্ধ-শান্তি-সন্ধি
কল্পনার কারণেই মানুষের গর্ব ও লজ্জার সৃষ্টি।
কল্পনা বা খেয়ালের ওপর ভর করে মানুষ চলে আর মানুষের চেষ্টায় জগত চলে। কল্পনাকে অস্তিত্বহীন ‘নাই’ মনে হলেও, ধরা ছোঁয়ার বস্তু না হলেও এর শক্তি অসাধারণ। আউলিয়ায়ে কেরামের যে খেয়াল বা কল্পনা, তার শক্তি- মাহাত্ম্য আরো অকল্পনীয়।
আন খেয়ালাতী কে দামে আউলিয়াস্ত
আক্সে মাহ্রূয়ানে বুস্তানে খোদাস্ত
৭২. ওই সব কল্পনা- যা অলিগণের ফাঁদ
তা আল্লাহর বাগানের চাঁদমুখদেরই প্রতিচ্ছবি।
সূফিতাত্ত্বিক দার্শনিকগণ এ বয়েতের সূক্ষ্ম সুদীর্ঘ ব্যাখ্যা পেশ করেছেন। থানবি (রহ.)-এর মতে আউলিয়ায়ে কেরামের ফাঁদণ্ডএর মর্ম মুরাকাবা ও মুকাশাফালব্ধ তত্ত্বজ্ঞান। শেখ আকবরাবাদির মতে ‘অলি আল্লাহদের কল্পনাসমূহ ‘যাতে হক’-এর জ্ঞানসমূহের ঝলকবিশেষ।’ তাঁদের কল্পনা পরম সত্যের সঙ্গে যুক্ত বিধায় সত্য ও বাস্তব। এই ঝলকে বিভোর হয়ে পড়লে অনেক সময় ‘যাতে হক’ এর ধ্যানে বাধা পড়ে যায়। তাই একে ফাঁদ আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রফেসর নিকলসনের মতে চাঁদমুখদের বলতে উদ্দেশ্য জামালে মুত্লাকের তাজাল্লী (যিনি সুন্দরের আধার, তাঁর ঝলকরশ্মি)। ‘আল্লাহ্র বাগান’ মানে খোদায়ী ইলমের সিফাত-আল্লাহ্র জ্ঞানগত গুণাবলী। (আকস) প্রতিচ্ছবি মানে ফয়েয। অর্থাৎ আল্লাহ্র জ্ঞানগত গুণ থেকে উৎসারিত জ্ঞানরাজির ফয়েজ, তাজাল্লি ও উদ্ভাস হলো অলি-আল্লাহদের খেয়াল ও কল্পনা- যা নফসের শয়তানি কুমন্ত্রণা ও কুধারণা থেকে মুক্ত।
অন্য কথায় আল্লাহর পক্ষ হতে খাস ইলহাম ও আত্মিক প্রেরণা ও স্বজ্ঞা সঞ্জাত।
আউলিয়ায়ে কেরামের খেয়াল দুই শ্রেণির। একটি হচ্ছে মুরাকাবা- অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি একাগ্রচিত্তে নিবিষ্ট হয়ে দুনিয়ার মায়াজাল ছিন্ন করে কোনো একটি বিষয় অন্তরে ধারণ করে একধ্যানে গভীরভাবে তা স্মরণ করতে থাকা, যেন তা অন্তরে বদ্ধমূল ও চোখে দৃশ্যমান রূপধারণ করে।
আরেকটি শ্রেণী হচ্ছে ‘মুকাশাফা’ : এটি ‘মুরাকাবা’র পরবর্তী স্তর। অলি-আল্লাহ যখন মুরাকাবার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন, তখন তাঁর অন্তরে নানা জ্ঞান ও তত্ত্বের উদয় হয়, সেটিকে দৈবজ্ঞানও বলা হয়। এই জ্ঞানের মাধ্যমে তিনি অনেক কিছুর গূঢ়তত্ত্ব বলে দিতে পারেন। এটিই মুকাশাফা। মওলানা রুমি (রহ.) ওপরের পংক্তিসমূহে সাধারণ খেয়াল বা কল্পনাকে অস্তিÍত্বহীন বস্তুতুল্য বলে সতর্ক করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে এদিকেও ইঙ্গিত করেছেন যে, অলি-আল্লাহদের ‘মুরাকাবা’ ‘মুকাশাফা’ খেয়াল বা কল্পনা হলেও তার সূত্র ও ভিত্তি মজবুত। নেক লোকদের শুভ স্বপ্নও ‘মুকাশাফা’ শ্রেণিভুক্ত।
আন খেয়ালি রাকে শাহ্ দার খাব দিদ
দার রুখে মেহমান হামী আমাদ পাদীদ
৭৩. যে কল্পনা বাদশাহ ঘুমে স্বপ্নে দেখেছিলেন
মেহমানের চেহারায় তা উদ্ভাসিত পেলেন।
নুরে হাক যাহের বুওয়াদ আন্দার ওলি
নে-ক বীন বাশী আগার আহ্লে দেলী
ক.ম. আল্লাহর ওলিদের মধ্যে আল্লাহর নুর দীপ্তিমান থাকে
অন্তর দৃষ্টির অধিকারী হলে ঠিকই তা দেখতে পাবে।
আন ওলিইয়ে হক চো পয়দা শুদ যে দূর
আয্ সরাপায়াশ হামী মী রীখ্ত নুর
ক.ম. আল্লাহ্র সে অলি যখন দৃশ্যমান হলেন দূর থেকে
ঝরে পড়ছিল নুরের ধারা তার আপাদমস্তক থেকে।
তখন বাদশাহ আত্মমর্যাদার কথা ভুলে গিয়ে ছুটে গেলেন রাজকীয় নিয়ম ভেঙে।
শাহ বেজায়ে হাজেবান ফা পীশ রাফ্ত্
পীশে আন মেহমানে গাইবে খী-শ রাফ্ত্
৭৪. দ্বার রক্ষীদের বদলে বাদশাহ নিজেই ছুটে গেলেন
আপন গায়েবি মেহমানকে গিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন।
বাদশাহ আর গায়েবি মেহমানের এ মিলন আধ্যাত্মিকতার পথে সাধকদের মিলন ও সিদ্ধিলাভের এক অবর্ণনীয় চিত্রকল্প। মনে হয় কেউ বাদশাহ নয় বা গায়েবি মেহমানও নয়; বরং
হার দো বাহরী আশেনা আমুখতে
হার দো জান বী দুখ্তান বার দুখ্তে
৭৫. দুজনই সাগরচারী সাঁতার জানা সুদক্ষ,
উভয় প্রাণই সেলাই ছাড়াই পরস্পরে সেলাইকৃত।
অর্থাৎ তারা দুজনই আল্লাহর মারিফাতের তত্ত্বজ্ঞান সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। বলা যায়, তারা সাঁতার-জানা সমুদ্রচারী। আর তাদের উভয়ের মাঝে অন্তর্জাগতিক এমন মিল ছিল, যার ফলে সাক্ষাতের সাথে সাথে উভয়ে পরস্পর এমনভাবে মিশে যান, কাপড়ের দুটি থান একত্রে সেলাই করে মিলিয়ে দিলে যেমনটি হয়। উভয়কে পরস্পর থেকে পৃথক করা যায় না; যদিও বাহ্যিকভাবে মাঝখানে সেলাই করা হয়নি।
আন য়্যকী লাব তেশ্নে দান দীগার চো আব
আন য়্যকী মাখমুর দান দীগার শরাব
ক.ম. মনে কর একজন পিপাসায় ওষ্ঠাগত আরেকজন তার পানি
একজন নেশায় বেঘোর অপরজন তার শরাব।
মোট কথা একজন অপরজনের পরিপূরক। দু’জন দু’জনায় সমাহিত। বাদশাহ না বলে পারলেন না-
গোফ্ত্ মাশুক্বাম তো বূদাস্তী না আন
লে-কে কার আয কার খীযাদ্ দার জাহান
৭৬. বললেন : আমার মাশুক তো তুমিই ছিলে, এই (দাসী) নয়,
তবে জগতে এক কাজে লেগে আরেক কাজ জাগে (এটিই হয়)।
তুমিই আমার প্রাণের মানুষ, আপনজন। আসলে আমি তোমাকেই চেয়েছিলাম। দাসীর প্রেম উপলক্ষ হয়ে ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে এখন আমি তোমাকে খুঁজে পেয়েছি। আমি তোমার, তুমি আমার। আমাদের উদাহরণ-
এই মোরা তো মুস্তাফা মন চো ওমার
আয বরায়ে খিদমাতাত্ বন্দম কামার
৭৭. আমার কাছে তুমি মুস্তফা, আমি যেন ওমর
তোমার খিদমতে উৎসর্গিত থেকে বেঁধেছি কোমর।
হজরত ওমর (রা.) যেমন জাহেলি যুগের সবকিছু ছেড়ে হজরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (সা.)-এর কাছে নিজকে উজাড় করে দিয়েছিলেন, তেমনি আমিও আপনার খেদমতে উৎসর্গিত হতে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে জানি যে, এ কাজে প্রথম শর্ত আদব। মওলানা এখন মানব চরিত্রের প্রধানতম ভূষণ আদব-এর শিক্ষা তুলে ধরছেন আমাদের সামনে।