অনলাইন সংস্করণ
১৬:২০, ১৪ মার্চ, ২০২৬
আমার বড় ভাই আকবর হোসেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট এর পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আমাদের জানামতে, তিনি শতভাগ সততা নিয়ে চাকরি করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলেই তাঁর সততার কথা আজো স্বীকার করেন। বলা যায় সাতক্ষীরার দেবহাটার সন্তান আকবর হোসেন সূদূর সিলেটে সততা নিয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতে গিয়ে শত প্রতিকূলতার সম্মুখিন হয়েছেন কিন্তু সব সময় তিনি সততা সর্বোচ্চ আঁকড়ে ধরেছেন। সাতক্ষীরার সুনাম বয়ে এনেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় গাছ লাগিয়েছেন নিজের অর্থ ও শ্রমের মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে দামী আগর গাছ লাগিয়েছেন। মেডিক্যাল সেন্টারের সামনে লাগিয়েছেন নারিকেল গাছ যাতে চিকিৎসাসেবা প্রত্যাশীরা ডাব সহজে পেতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের একমাত্র মেইন গেটের সন্নিকটে নিজের অর্থে মূল্যবান গাছের বাগান করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ের পাদদেশে প্রচুর নিম গাছ লাগিয়েছেন। সহজ কথায় বিশ্ববিদ্যালয় চাকরি জীবনে বেতন ও সম্মানির লক্ষ লক্ষ টাকা গাছ লাগানোর পিছনে ব্যয় করছেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলররা আকবর হোসেনকে তাঁর সততা ও যোগ্যতার জন্য সমীহ করতেন এবং মূল্যায়ন করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুদ্ধাচার বিষয়ক কমিটিতে তাঁকে রাখতেন।
সাতক্ষীরা জেলার কোন ছেলে-মেয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলে তিনি খুশি হতেন। দেবহাটার কেহ চান্স পেলে তাঁর খুশি আরো বেড়ে যেতো। প্রথম দিকে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতেন।
দেবহাটা উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের একটি ইউনিয়ন নওয়াপাড়া। এ ইউনিয়নের নওয়াপাড়া গ্রামে ১৯৫৮ সালের ১০ই মার্চ জন্মগ্রহন করেন। পিতা: মোঃ আককাজ আলী এবং মাতা মিসেস জোহরা আককাজ এর আদরের বড় সন্তান। গ্রামের সে সময়ের প্রতিকূল পরিবেশে থেকেও উচ্চ শিক্ষা গ্রহনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। খানজিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর হাতে খড়ি। নলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে এসএসসি পাস করেন। খুলনার আযম খান কর্মাস কলেজ থেকে ১৯৭৫ সালে এইচএসসি পাস করেন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিন্যান্স বিভাগে ১৯৭৫-১৯৭৬ সেশনে ভর্তি হন। ১৯৭৮ সালে সালে বিকম (অর্নাস) এবং ১৯৭৯ সালে এমকম (ফিন্যান্স) ডিগ্রী অর্জন করেন। কবি জসিম উদ্দিন হলের ৪২০ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। পড়াশুনার পাশাপাশি স্কাউটের সাথে ওতপ্রোভাবে জড়িত ছিলেন। সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সমপৃক্ত ছিলেন। হল সংসদের নির্বাচনে এজিএস পদে নির্বাচন করেছিলেন।
আকবর হোসেনের সমগ্র ছাত্র জীবন বানিজ্যের হলেও তিনি বিজ্ঞান মনষ্ক ছিলেন। ছাত্র-ছাত্রীদের বিজ্ঞান অধ্যয়নে উৎসাহিত করতেন। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক সাবজেক্টে সাতক্ষীরার ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করতেন।
আকবর হোসেন সাবলীলভাবে চাইতেন সাতক্ষীর তথা দেবহাটার সামগ্রিক উন্নয়ন হোক। শিক্ষা-দীক্ষা-সংস্কৃতিতে দেবহাটার অগ্রসরতা প্রত্যাশা করতেন। দেবহাটার ঐতিহ্য নিয়ে গর্ববোধ করতেন। দেবহাটা পৌরসভার (১৮৬৭-১৯৫১) কথা বার বার বলতেন। দেবহাটায় আবার পৌরসভা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন তা পুর্নব্যক্ত করতেন। রাস্তা-ঘাটের সংস্কার, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে প্রসারের কথা বলেছেন। বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা কথা বলেছেন।
আকবর হোসেন দেবহাটার জন্য এখনো প্রাসাঙ্গিক। সততা ও সাহসে নিজের সাধারন অবস্থানকে অসাধারন করেছেন। ছোট ভাই হিসেবে যখন বড় ভাই আকবর হোসেনের সুনামের শুনি, তখন আমার অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে। মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই, তিনি এমন আদর্শবান বড় ভাইয়ের সহোদর ছোটভাই হিসেবে জগতের আলো-বাতাস দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। নিজের অজাতেই দায়বদ্ধতা অনুভব করি। সাদাকে সাদা বলার সৎ সাহস চলে আসে। প্রতিকূলতা জয় করার ইচ্ছে জাগে। আমার বড় ভাই আকবর হোসেনের সুনাম ধরে রাখার জন্য সুপথে চলতে ইচ্ছা হয়।
আকবর হোসেন সম্মানের সাথে ২০১৮ সালে ২২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে আমাদের থেকে চিরতরে চলে গেছেন। তাঁকে দেখতে ভাইস-চ্যান্সলর অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ সহ শিক্ষক কর্মকর্তা তাৎক্ষিণকভাবে হাসপাতালে উপস্থিত হন ও সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় শিক্ষকেরা যে ভাবে কেঁদে ছিলেনে তা মনে হলে ছোট ভাই হিসেবে গর্বে বুক ভরে ওঠে। বড় ভাই হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্বজনিন হতে পেরেছিলেন, এজন্য সকলে তাঁকে সম্মান দেখিয়েছেন। তাঁর নিজ গ্রামে ২৩শে অক্টোবর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর জানাযায় তৎকালীন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্টার আহমেদ মাহবুব ফেরদৌস, পরিকল্পনা কর্মকতা আশরাফুল ইসলাম, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার প্রকৌশলী মোঃ আহসান হাবীব সহ অসংখ্য সুহৃদ অংশ গ্রহণ করেন।
তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় বাগোরহাট প্রাথমিক জেলা শিক্ষা অফিসে ২৪-১০-১৯৮২ সালে সহকারী হিসাব রক্ষন অফিসার হিসেবে। এরপর তিনি বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করর্পোরেশনে ১৫-১২-১৯৮৪ সালে প্ল্যানিং অফিসার ও ৩০-০৭-১৯৯১ সালে সিনিয়র প্ল্যানিং অফিসার হিসেবে চাকরি করেছেন। এরপর উপপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদে ২৭-০৪-১৯৯৪ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তাঁর সততা ও নিষ্ঠার কারণে এবং সাতক্ষীরা বাড়ি হওয়ায় ২০০৯-২০১০ সালে পরিচালক পদে পদোন্নতি বঞ্চিত হন। সে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিরুপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়লে তাঁকে পরিচালক পদে ২০১১ সালে পদোন্নতি দিতে বাধ্য হন। প্রায় দুই যুগ এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবেক হিসেবে চাকরি করেন।
তিনি সাতক্ষীরা শহরের মনজিতপুরে ডা. আবুল কাশেম ও শিক্ষিকা নুরুন্নাহার এর একমাত্র কন্যা নাজমুন নাহার লাভলীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের কন্যা সন্তান আফতাবুন নাহার শিল্পী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছে। তাঁর একমাত্র জামাতা আমিরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসিমউদ্দিন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।
বড় ভাই কেবল পড়াশুনা বা চাকরি পছন্দ করতেন না। তাঁর অনুপ্রেরণায় বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের চাকরিতে যোগদান করি। সময়ের পরিক্রমায় অফিসার্স ক্লাব ঢাকা'র নির্বাহী কমিটির নির্বাচনে তিনবার বিপুলভোটে নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। বড় ভাইয়ের আর্থ-সামাজিক কাজের সম্পৃক্ততা আমার জন্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। তিনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে এক সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। খুলনা বিভাগীয় সমিতি, সিলেট প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন।
তিনি চাইতেন আমি যেন নিজের পাঁয়ে ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলতে শিখি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ৬০ এর দশকের শিক্ষক আমেরিকা প্রবাসী নানা ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ'র সহযোগিতায় আমার আমেরিকার যাওয়াকে প্রশ্রয় দেননি। যোগ্যতা অর্জনের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। এমনকি তিনি আমেরিকা যাওয়ার সুযোগ গ্রহণ করেন নি।
বড় ভাইয়ের সুনাম রক্ষায় সরকারি চাকরি জীবনে আমি নিজেও সঠিক পথে চলার চেষ্টা করেছি। মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ২০১৪ সালের ১৫ই মার্চে স্রোতের বিপরীতে নির্বাচনে ফ্রি ফেয়ার উপহার হার দিতে সক্ষম হয়েছিলাম যা বাংলাদেশে নির্বাচনি ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে আকবর হোসেনের গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে। ক্যাপ্টেন শাহজাহান মাষ্টারের সাথে তাঁর চমৎকার সম্পর্ক ছিল। ২৫-০১-১৯৮৭ সালে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ১২৫ নম্বর ক্রমিকে তাঁর নামটি বিদ্যমান রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি ব্যক্তি জীবনে বা চাকরি জীবনে কোন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেননি। তিনি বলতেন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে দেশ স্বাধীনের জন্য ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্য। ব্যক্তি বিশেষের বাড়তি সুবিধা গ্রহণের জন্য নয়।
আমার বড় ভাই হয়তো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বড় চাকরি করেন নি, স্বাভাবিকভাবেই সরকারের সচিব হন নি। কিন্তু তাঁর ব্যাচমেট বন্ধু ড. শেখ আব্দুর রশিদ স্যার মন্ত্রিপরিষদ সচিব হলেও আমার বড় ভাইয়ের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। অভিব্যক্তিত্বে সম্মান দেখিয়েছেন। কিন্তু এসএসবি'র সভাপতি হয়ে তিনি আমাকে পদোন্নতি বঞ্চিত করেছেন। বড় ভাইয়ের মতো আমার পদোন্নতি বঞ্চনার অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে। তিনি আমাকে পদোন্নতি বঞ্চিত করলেও বড় ভাই'কে সম্মান দেখিয়েছেন সেটাই বড় পাওয়া, অনেক সস্তির বিষয়।
আকবর হোসেন ফাউন্ডেশন সীমিত পরিসরে চালু রয়েছে। দেবহাটাসহ সাতক্ষীরার অন্যান্য উপজেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তির ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ধীরে ধীরে এ ফাউন্ডেশনের কলেবর বৃদ্ধি পাবে এবং সাতক্ষীরার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। বড় ভাইয়ের সততা, সাহস যোগ্যতার কারণে তিনি আমাদের বাতিঘর। সারা বাংলাদেশে তাঁর নামে এক লক্ষ গাছ লাগানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে চলেছে। তাঁর বা তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষকে সহযোগিতার প্রত্যয় সব সময় রয়েছে।
মোঃ আলমগীর হোসেন
উপসচিব,
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়