
আগামীকাল আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হয়। জাদুঘর সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর ১৮ মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস উদযাপন করা হয়। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ মিউজিয়াম (আইকম) প্রতিবছর এ দিবসের জন্য একটি প্রতিপাদ্য বা বিষয় নির্ধারণ করে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো 'মিউজিয়াম ইউনাইটিং এ ডিভাইডেট ওয়াল্ড।' যার বাংলা করলে দাঁড়ায় 'বিভক্ত বিশ্বের সেতুবন্ধনে জাদুঘর'।
এবারের প্রতিপাদ্যটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, বর্তমান বিশ্বের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক বিভেদ দূর করতে জাদুঘরগুলো কিভাবে সেতুবন্ধনের মতো কাজ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্যগুলো হলো- জনসচেতনতা বৃদ্ধি: বিশেষ করে সমাজের উন্নয়নে জাদুঘরের ভূমিকা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ: বিলুপ্তপ্রায় শিল্পকর্ম এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের গুরুত্ব জনগণের সামনে তুলে ধরা। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিনিময় মধ্যে সাংস্কৃতিক বন্ধন তৈরি করা।
ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ মিউজিয়াম (আইকম) জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য সহযোগি সংস্থা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে ২০২০ সাল থেকে প্রতিবছর এক বা একাধিক টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্বাচন করে।
এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় টেকসই উন্নয়নের ৩টি লক্ষ্যমাত্রাকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে। যেখানে মনে করা হচ্ছে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ১০, ১৬ ও ১৭ অর্জনে জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ও রেখে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা দশ (১০) হচ্ছে বৈষম্য হ্রাস করা। মূলত, জাদুঘর এমন একটি সার্বজনীন প্লাটফর্ম যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও স্বদেশ-বিদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে। জাদুঘর অসমতা বা বিভেদের চেয়ে সমতার ভিত্তিতে সকলের অবস্থানকে নিশ্চিত করে। তাই, বৈষম্যভেদে জাদুঘর হয়ে উঠতে পেরেছে সবার অতীতের উৎস ও মিলনের কেন্দ্রস্থল।
এবারের আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়ে আরেকটি টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তা হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা ষোল (১৬)। এখানে বলা হয়েছে শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠন। আদর্শিক অর্থে জাদুঘর সকলের সহবস্থান নিশ্চিত করে। এখানে সার্বজনীনভাবে শুধু ইতিহাস, প্রত্নবস্তু ও ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দেয়া হয় এবং যা, সকল বিভেদে সকল ধর্ম-বর্ণ-জাতির প্রতিনিধিত্ব করে। তাই একটি শান্তিময় সমাজ গঠনে জাদুঘর শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পালন আসছে।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য বিষয়ে আরো একটি টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, তা হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা সতের (১৭)। এর মূল বিষয় হচ্ছে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন। এই লক্ষ্য অনুযায়ী সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত সহযোগিতার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
এক্ষেত্রে জাদুঘর হতে পারে একটি উপযুক্ত প্লার্টফম। জাদুঘরই পারে সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং ভূ-রাজনৈতিক বিভেদের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে।
একই সাথে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ও নিজেদের মধ্যে সংলাপ, বোঝাপড়া, অন্তর্ভুক্তি এবং শান্তিকে উৎসাহিত করার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে এই জাদুঘরগুলো। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয়ে বিশ্বের জাদুঘরগুলির মধ্যে প্রযুক্তিগত বিনিময়, দক্ষতা বৃদ্ধি, তথ্য আদান-প্রদান এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্বকে জোরদার দিয়ে দারিদ্র্য দূরীকরণ, পরিবেশ সুরক্ষা ও মানবকল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ মিউজিয়াম (আইকম) বিশ্বাস করে সারা বিশ্বের জাদুঘরগুলোর মধ্যে কোন সীমারেখা নেই এবং এই সংস্থাটি বিশ্বের জাদুঘরের মধ্যে যোগাযোগের সেতু বা নেটওয়াক তৈরি করে।
দিবসটির ইতিহাস:
ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ মিউজিয়াম (আইকম) ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কাউন্সিল -এর আহবানে ১৯৭৭ সালে প্রথমবার আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস পালিত হয়। সেই থেকে প্রতিবছরই ১৮ মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তবে এ বছরটি আইকমের জন্য একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর। এ বছর সংস্থাটি ৮০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে। তাই ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসটি বিশ্বব্যাপী আরো বড় পরিসরে উদযাপন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বর্তমানে ১৩৯টি দেশ ও অঞ্চল আইকমের সদস্য এবং সারা বিশ্বে ষাট হাজারের অধিক ব্যক্তি এর সদস্য। বাংলাদেশেও রয়েছে ৬০ এর অধিক সদস্য।
জাদুঘরের পরিধি:
জাদুঘর আজ কেবল প্রাচীন বস্তুর সংগ্রহশালা নয় বরং এটি বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরির একটি শক্তিশালী মাধ্যম। জাদুঘরের পরিধি ক্রমেই পরিবর্তিত ও প্রসারিত হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ মিউজিয়াম (আইকম) কর্তৃক ১৯৪৬ সালের একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সময়ের ব্যবধানে ২০২২ সালে সে সংজ্ঞা অনেক পরিবর্তিত ও প্রসারিত হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে জাদুঘর হচ্ছে মূর্ত-বিমূর্ত ঐতিহ্যগত বন্ধু প্রদর্শন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং গবেষণাসহ অন্তর্ভুক্তিমুলক বিনোদন, জ্ঞান চর্চা ও আদান-প্রদানের কেন্দ্রস্থল।
বাংলাদেশে জাদুঘরের পদচারণা:
জাদুঘরের ইংরেজি মিউজিয়াম। এই মিউজিয়াম শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ মাউসিয়ন থেকে। যার অর্থ মিউজ দেবীদের মন্দির বা মিউজেসদের আসন। যেখানে দর্শন চর্চা, শিল্পকলা ও গবেষণার স্থান। বাংলায় জাদুঘর কথাটির অর্থ হলো, যে গৃহে অদ্ভুত সামগ্রী সংরক্ষিত থাকে ও যা দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হতে হয়। এ উপমহাদেশে জাদুঘরের ধারণাটি এসেছে বৃটিশদের হাত ধরে। ১৮১৪ সালে কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে এ অঞ্চলের প্রথম জাদুঘর 'এশিয়াটিক সোসাইটি মিউজিয়াম' প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১০ সালে দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজশাহীতে গড়ে উঠে 'বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর'। যা বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর এবং পরবর্তীতে ঢাকাবাসীদের বহু চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১৩ সালে ৭ আগষ্ট 'ঢাকা জাদুঘর' আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। যা আজকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর নামে পরিচিত।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর:
বাংলাদেশে শতাধিক জাদুঘর থাকলেও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরকে প্রধান জাদুঘর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে, ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিল্পকলা, সংস্কৃতিগত ও প্রাকৃতিকসহ ৯৩ হাজারের বেশি নিদর্শন রয়েছে। দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার জন্য রয়েছে ৪৬টি গ্যালারি। প্রতি বছর ৫ লক্ষের অধিক দর্শক এখানে পরিদর্শন করে। বর্তমানে দর্শকদের আরো আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন ইন্টারএ্যাক্টিভ ও প্রযুক্তিগত সংযোজনার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সাথে সাংস্কৃতিক বিনিময় প্রদর্শনীর আয়োজন, স্টেকহোল্ডারদের আরো বেশি সম্পৃক্তকরণ, প্রদর্শন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং বিভিন্ন কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে। নানান সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে একটি দর্শকবান্ধব, প্রযুক্তির নির্ভর, অত্যাধুনিক, ভবিষতের জাদুঘর গড়ে তুলতে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর নিরালসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রতিবছরই ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ মিউজিয়াম (আইকম) থেকে সারা বিশ্বের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা বহন করে। যেখানে সারা বিশ্বের শান্তি, বৈষম্য দূরীকরণ ও পরির্বতনের কথা বলে। মূলত সারা বিশ্ব আজ এক অস্থিরতা ও সংঘর্ষে লিপ্ত। জাদুঘর হয়ে উঠতে পারে এই অস্থিরতা প্রশমনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অতীতের ইতিহাস থেকে জাদুঘর সমাজকে বার্তা দেয় বিভাজন নয়, ঐক্য; সংঘাত নয়, সহমর্মিতা; বিচ্ছিন্নতা নয়, সাংস্কৃতিক সংযোগই মানব জাতির অগ্রগতির মূল ভিত্তি।
লেখক
কীপার ও বিভাগীয় প্রধান (জনশিক্ষা)
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।