প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
ভাবখানা এমন, আমি অনেক কিছুই জানি। তবে যেন জানি না বললেই চলে দর্শন, আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, ইলমে ফিকহ এবং আইনশাস্ত্র। কেননা, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে আমার একাডেমিক পড়াশোনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি আছে। তাই আবিষ্কার করতে পেরেছি, এই বিষয়গুলো সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানি না।
আমার এই না জানাটা প্রায় অজ্ঞের পর্যায়ে। কিতাব, দর্শন, হিকমা এবং কানুন সম্পর্কে যে অকূল জ্ঞানের পাথার তার বেলাভূমিতে সামান্য নুড়ি কুড়িয়ে জীবন যৌবনের সীমানায় পৌঁছেছে তবুও জ্ঞানের ব্যাপ্তি শূন্য। মাঝে মাঝে জ্ঞানের অপূর্ণতায় নিজেকে অসহায় মনে হয়। যারা সুন্দর লেখেন, দারুণ বলেন তাদের দিকে বিমুগ্ধ ব্যাকুলতায় অপার হয়ে চেয়ে থাকি।
অথচ আমি জানি, বলে দাবি করি চিকিৎসাশাস্ত্র, রাজনৈতিক অঙ্ক, ইতিহাস, সাহিত্য কিংবা ভূগোল! যে বিষয়ে পড়াশোনাই করিনি সে বিষয়ে জ্ঞানীর ভাবধরা সহজ। কেননা, সে-সবের মধ্যে যা- কিছু আছে তা তো পৃষ্ঠা উল্টিয়েও দেখিনি। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের নাম জানি বলে, মোঘল সম্রাটদের দেশ জানি বলে, দু’জন রাষ্ট্রনায়ক এবং শাসক-শোসকের উক্তি জানি বলে কিংবা দু-দেশের সীমারেখার অক্ষ ডিগ্রি চাকরির পরীক্ষার জন্য মুখস্ত করেছিলাম বলে ধরেই নিয়েছিলাম সব শাস্ত্রে আমি পণ্ডিত হয়ে উঠেছি!
পারমানবিক বোমার ফিশন, হাইড্রোজেন বোমার ফিউশন না বুঝে পড়ে মুখস্ত করেই ধরে নিয়েছিলাম আমি তো বিজ্ঞানী হয়ে উঠেছি। লবণকে যে মনসোডিয়াম গ্লুটামেন্ট বলে আবাল বয়সে সেটা জেনে একটু-আধটু বৈজ্ঞানিক বাহাদুরি ভর করেছে মনের কোণে।
আমরা যা আদৌ জানি না কিংবা যা জানি, একেবারে ভাসা ভাসা তা নিয়ে অহমিকার শেষ নেই। পণ্ডিতদেরও প্রশ্নবিদ্ধ করি, কাঠগড়ায় দাঁড় করাই অন্যের জানাশোনাকে। আমরা অল্প জানা নিয়ে লাফালাফি করি অন্যের বিশেষজ্ঞায়িত ডিসিপ্লিনে। যে জানে সেও বা কতটুকু জানে এই অসীমের আয়োজনে?
মানুষ কখনোই সর্বজ্ঞানী হয়ে উঠতে পারে না। যে শুধু দেখতে পায় দৃশ্যমান দুনিয়া সে কখনোই অদৃশ্য দেখার ক্ষমতাসীনের সমকক্ষ নয়। আত্মজ্ঞান আহরণে আত্মমগ্ন হতে হবে। অহংকার ত্যাগ করতে হবে চিরতরে। যার মনে সামান্য পরিমাণেও দম্ভ আছে সে আসলে জ্ঞানরাজ্যের কিছুই অর্জন করতে পারে না।
যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা সমান নয়। সসীমের মধ্যে প্রত্যেকের জানার আবার আরোপিত সীমানা আছে। অন্তঃচক্ষু উন্মুক্ত হয়ে দিব্যজ্ঞানের ধারকদের কিতাবি জ্ঞানসম্পন্নদের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। যার মধ্যে আপতিত হয়েছে ঐশ্বরিক আলো সে সাধারণের ঊর্ধ্বে তবে তাঁরা সংখ্যায় কম। যারা জানার চেষ্টা করে জীবনের সমীকরণ বা বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে তারাও আসলে বিষয়ের আংশিকই জানে।
সেই সত্যের সন্ধানই শুধু তারা পায় যে সত্যকে কাস্টমাইজড করে তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। তবে মূল সত্য তখনই আবিষ্কার হয় যখন যে-কেউ সত্য উন্মোচনে ধ্যানে-জ্ঞানে ব্রতী হয়। জানা নাকি মানা জরুরি- সেই বিতর্কে জানার এই ধাপে যাচ্ছিনে। বাঁচতে হলে জানতে হবে এই স্লোগানও সব ব্যাপারে খাটে না।
জ্ঞান এক বিস্তৃত অসীম সীমার সাগর, চলমান-বহমান। আমরা জ্ঞান সমুদ্রের খুব সামান্যের সাথেই সাক্ষাৎ করতে পারি। এর আদি আর অন্ত কত যে বিস্তৃত, কত সম্মৃদ্ধ এবং কতখানি গভীর তা যারা জ্ঞানসমুদ্রে সাঁতার না দিয়েছে, ডুব না দিয়েছে কিংবা হাতরে না দেখেছে তারা ছাড়া আর কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। এখানে সৃষ্ট প্রত্যেকটা শব্দের দিগন্ত বিস্তৃত ব্যাখ্যা আছে। জ্ঞানে শেষ মাথা বলে আসলে কিছু নেই। চিন্তার অবসান বলে কোনোদিন কোনোকিছুই ঘটে না।
যে যত বেশি পড়ে, খোঁজে এবং প্রশ্ন করে তার সামনে আরও বেশি, তারও বেশি উপস্থিত হয়। জ্ঞানের রাজ্যে মানুষ আসলে ক্ষুদ্রত্ব নিয়ে দাঁড়াতে পারে। এখানে যতটা আলো আছে সূর্যের ভেতরেও ততটা আলো নেই হয়তো। হৃদয়কে আলোকিত করার চেয়ে পুণ্যবান আর কিছুতে কি হয়? নিজেকে চেনার এবং অন্যকে জানার প্রশ্নে আবৃত থাকতে হবে। দুনিয়া সুন্দর। নিজেকে আবিষ্কার করতে পারা আরও বেশি মোহনীয়।