প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
অসুখ যখন কারও সঙ্গী হয় তখন স্বস্তি তার কাছ থেকে দূরে থাকাটাই স্বাভাবিক। অসুখের বিস্তার ঘটালে আমরা তিন ধরনের বিভাজন দেখতে পাই। যথা : দৈহিক, মানসিক ও মনোদৈহিক। বলার অপেক্ষা রাখে না, মৃত্যু অবধি অসুখের দৌরাত্ম্য নিয়ে বেঁচে থাকা জার্মান কালজয়ী কথাসাহিত্যিক ফ্রানৎস কাফকা অসুখের উপরোক্ত তিনটি শ্রেণিবিন্যাসেরই আওতায় পড়েছেন। অসুখের কারণে তিনি একদিকে যেমন স্বস্তি বঞ্চিত হয়েছেন, তেমনি অন্যদিকে রয়ে গেছেন অকৃতদার। প্রণয় সত্ত্বেও বাগদান শেষে তার সংসার হয়ে ওঠেনি শুধু অসুখ তার স্বস্তি কেড়ে নিয়েছিল বলেই। কর্তৃত্ববাদী বাবার কারণে তার কাছে সর্বদাই মনে হতো তিনি আসলে জন্ম নেননি কিংবা পিতার সংসারে তিনি কোনো এক অচেনা আগন্তুক বুঝি। তিনি নিজেই মনে করেন, তার দৈহিক অসুখ আসলে চেতনাগত অসুখের বিস্তার বৈ আর কিছুই নয়। তার চিন্তার জগতে, তার মননের রাজ্যে যে অস্থিরতা, যে ভাঙাগড়া বা টানাপড়েন, তারই দৃশ্যমান বিস্তৃতি হলো দৈহিক অসুখ যা রোগ বলে আমরা অভিহিত করি।
অসুখ একদিকে যেমন কাফকার জীবনকে প্রভাবিত করেছে তেমনি অন্যদিকে তার চেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে তার সাহিত্যকে। তিনি তার সাহিত্যের মধ্যে নিজের অসুখকে সজ্ঞানে কিংবা অবচেতনে বরাবর চিত্রিত করে গেছেন। কাফকার অসমাপ্ত তিন উপন্যাস, ছোট ও বড় গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধের অধিকাংশতেই অনিদ্রা ও অনিদ্রাসম্ভূত অসুখের কথা লিপিবদ্ধ আছে। অসুখের সঙ্গে সম্পর্কিত কাফকার রচনাবলির মধ্যে— ১. চিন্তা (Betrachtung. Leipzig ১৯১২), কাফকার প্রথম বই। ২. রূপান্তর (দ্য মেটামরফোসিস)।
৩. বন্দিশিবির (ইন দ্য পেনাল কলোনি), ৪. বিচার (দ্য ট্রায়াল), ৫. দূর্গ (দ্য ক্যাসেল), ৬. আমেরিকা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। রচনাবলির অধিকাংশ কেন্দ্রীয় চরিত্রের মধ্যে কাফকা তাঁর মনোদৈহিক অসুখের বিস্তার ঘটিয়েছেন।
কাফকার জীবনকে পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, উনিশশো বারো সালে তিনি প্রথম আত্মহননের কথা গুরুত্ব সহকারে ভেবেছিলেন, বিশেষত যখন তার প্রিয় বোন ওঠলা (Ottla), যে তাকে কিছুটা হলেও বুঝতে পারত, সে পারিবারিক কলহকালে বাবা-মার পক্ষ নিয়েছিল। জনকের সঙ্গে বসবাস তাই কাফকার কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। নিজের ঘরে এবং শহরে অনাহুত মনে করা কাফকা ছিলেন বিষণ্ণ প্রকৃতির, অনিদ্রাক্লিষ্ট, খাদ্য বিষয়ে খেয়ালী, সিদ্ধান্ত গ্রহণে নড়বড়ে, জীবন কর্তৃক ভীতি সম্পন্ন এবং মৃত্যু বিষয়ে ঘোরগ্রস্ত এক লেখক। পিতার প্রতি লেখা তার দীর্ঘ চিঠি হতে জানা যায়, কাফকা তার ত্রুটিপূর্ণ চলনশৈলির কারণে নিজেকে হীনমন্য ভাবতেন। উনিশশো ছয় সালের ১৮ জুন প্রাগে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যখন কাফকা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন, ঠিক সেসময়েই তার ফুসফুসে যক্ষার লক্ষণ দেখা দেয় যা তার মাত্র ৪১ বছর বয়সে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিমা কোম্পানির চাকরির ফাঁকে তিনি দুপুরের সময়টা নিজের করে রেখেছিলেন যাতে লেখালেখিতে ব্রতী হতে পারেন। কিন্তু বিধিবাম! রোগজনিত ক্লান্তি তাকে বিশ্রামে বাধ্য করায় তার অধিকাংশ বুদ্ধিবৃত্তিক কাজই রাত জেগে করতে হতো। এতে অনিদ্রা তার সহচর হয়ে দাঁড়ায়। কাফকা নিজেকে ঘুমবঞ্চিত করে যখন লিখতে বসতেন, তখন স্বপ্নের মতো তন্দ্রাচ্ছন্ন হ্যালুসিনেশনে ভুগতেন।
স্বনন বা আওয়াজ হয়ে যায় তার শ্রবণে অসহনীয়। সমুদয় কারণে তার দেহে লোমফোঁড়া, স্নায়বিক বৈকল্য, কোষ্ঠকাঠিন্য ও শারীরবৃত্তীয় কর্মকাণ্ডের বিভ্রাট দেখা দেয়। তার মস্তিষ্ক অনেকটাই জাগ্রত কিন্তু অচেতন অবস্থায় পৌঁছে যায়। এর পরিণাম হিসেবে কাফকা অবিকল্পভাবেই নিরামিষাশী হয়ে যান। কাফকা খেতে পছন্দ করতেন না। হেনরি ফ্লেচার নামের একজন পুষ্টি গবেষক দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বরং অল্প খাবার অনেকক্ষণ মুখে দিয়ে রাখতেন। কিছুক্ষণ পর পর চিবিয়ে নিতেন। কাফকার ধারণা ছিল একমাত্র এভাবে খেলেই খাবারের প্রতিটি উপাদানকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব। এ অভ্যাস তাকে মারাত্মক স্বাস্থ্যহানির দিকে ঠেলে দেয়। ১৯২৪ সালের তেসরা জুন অস্ট্রিয়ার কিয়ের্লিংয়ে মারা যান কাফকা। যক্ষাক্রান্ত হলেও তার মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়েছিলো খাদ্যগ্রহণে অনীহাজনিত পুষ্টিহীনতা। উনিশশো নয় সাল এবং ১৯১৩ সালে কাফকা স্নায়বিক দৌর্বল্যের কারণে রিভা ডেল গার্ডায় একটা ক্লিনিকে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। এ সময় তার হার্ট এবং ফুসফুসের অসুখেরও চিকিৎসা করানো হয়। এর কয়েক বছর পর তার স্নায়ু যেন নষ্ট হয়ে যায়। তিনি ঘন ঘন তীব্র শিরঃপীড়ায় আক্রান্ত হন এবং প্রগাঢ় বিষণ্ণতায় ভোগেন। মাইগ্রেন বা আধকপালির এ ব্যাধি তাকে আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করেছিলো বলে জানা যায় যদিও তা বাস্তবায়ন করেননি। ১৯১৭ সালের ৯ আগস্টে তার ফুসফুসের যক্ষা সুনিশ্চিতভাবে নির্ণীত হয় এবং কাশিতে রক্তক্ষরণ হয়। তার ভাষ্যে আমরা এ রক্তক্ষরণ সম্পর্কে জানতে পারি; 'সেদিন আনুমানিক ভোর চারটায় আমি জেগে উঠি এবং মুখভর্তি লালা জমে যাওয়ায় আশ্চর্যান্বিত হয়ে উঠি। আমি মুখভর্তি লালা থু করে ফেলে দিয়ে ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দেই। 'তিনি তার ভাষ্যে আরও বলেন, রক্তের এই ঝর্ণাধারা অবলোকন করার পর থেকেই দৈহিক যক্ষার পাশাপাশি তার চেতনার যক্ষা বা ক্ষয় শুরু হতে থাকে। যক্ষা মারাত্মক হতে শুরু করলে তিনি মিরানোতে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং এ সময় মিলেনা জেসেনস্কার সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। পরবর্তী সময়ে মিলেনা জেসেনস্কার কাছ থেকে অকাল প্রয়াত কাফকার দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তিমকালের বিবরণ পাওয়া যায়। তিনিই জানান, কাফকার অন্তিমকালের আত্মহননের বায়ুগ্রস্ততার কথা। রোগ শয্যায় কাফকা ব্যক্তিগত রিক্ততা এবং অসহায়ত্বের শিকার হয়েছিলেন। ১৯২৪ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে কাফকার ফুসফুসের যক্ষা তার স্বরথলি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তখনও পর্যন্ত যক্ষার জীবাণুর কোন উপযুক্ত চিকিৎসা আবিষ্কার না হওয়ায় কাফকাকে চিকিৎসকরা প্রতিকারমূলক চিকিৎসার পরিবর্তে রোগযন্ত্রণা লাঘবের চিকিৎসা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কণ্ঠনালীতে অবস্থিত অ্যারাইটিনয়েড নামক তরুণাস্থি সংক্রমণাক্রান্ত হওয়ার কারণে কাফকা শেষদিকে তীব্র ব্যথায় খেতে এবং ঘুমাতে পারতেন না। বিছানায় অসহায় পড়ে থেকে দেহের চেয়ে অধিক মনের যন্ত্রণা নিয়ে ফ্রানৎস কাফকা ১৯২৪ সালের ১৭ জুনে মাত্র ৪১ বছরের ফসলী জীবন শেষে পরলোকে পাড়ি জমান।
কাফকা মৃত্যুর আগে তার প্রেমিকা মিলেনাকে লেখেন, 'মস্তিষ্ক তার উপর প্রযুক্ত চাপ এবং যন্ত্রণা আর নিতে পারছে না। কেউ যদি আমার মস্তিষ্কের চিন্তার ভার কিছুটা সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নিয়ে ভার লাঘব করত তাহলে হয়তো আমি আরও কিছুকাল বেঁচে থাকতে পারতাম। এরপরেই তো ফুসফুস এগিয়ে এসে মস্তিষ্কের ভার নিলো। ফুসফুস ও মস্তিষ্কের মধ্যে ভার নেওয়ার এ বোঝাপড়া আমার অজান্তে যদিও ঘটেছে, কিন্তু যা হয়েছে তা ভীতিকর। 'মিলেনাকে তিনি আরও লেখেন,' আমি মানসিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছি। ফুসফুসের অসুখটা আর কিছু নয়, মানসিক অসুখের ঢেউ উথলে পড়া মাত্র।
কাফকা ফ্রয়েডের একজন গুণমুগ্ধ পাঠক ছিলেন। ফ্রয়েডের মতোই তিনি বিশ্লেষণবাদী এবং বারে বারে শৈশবের ঘটনাবলি রোমন্থন করতেন। পিতাপুত্রের সম্পর্ককে তিনি মনের আতশকাঁচের নিচে রেখে সর্বদা যাচাই করতেন। তার রচনায় প্রধান চরিত্রগুলো থাকত বেদনামলিন। এগুলোর জীবন্যাসের মধ্যে দিয়ে তিনি তার নিজের জীবনকে কিছু না কিছু চিত্রিত করে তুলেছেন। দূর্গ, বিচার (দ্য ট্রায়াল) ও আমেরিকা নামক অসমাপ্ত ঔপন্যাসিকায় প্রধান চরিত্রগুলো অপরাধবোধে সর্বদা বিচূর্ণ হতো মানসিকভাবে। অনেকটা তাদের স্রষ্টা কাফকার মতোই। কাফকার রচনার বিভিন্ন অংশে বিভিন্নভাবে অনিদ্রা এবং নিদ্রা উপভোগে অসমর্থ হওয়ার কথা ফুটে উঠেছে। চরিত্রগুলো তাদের স্রস্টার মতোই যেন কখনও শান্তি ও স্বস্তিতে ছিল না, এমনকি না আহার গ্রহণের সময়, না শয্যাগত হওয়ার কালে। কাফকার গল্পের চরিত্রগুলো শারীরিক স্বাস্থ্যে সুঠাম হলেও মানসিক স্বাস্থ্যে ছিল ভঙ্গুর। উদাহরণস্বরূপ 'দূর্গ' উপন্যাসিকার কেন্দ্রীয় চরিত্র মি. 'কে'-র কথা বলা যায়। উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা মি. ব্রুজেল তাকে অলৌকিকভাবে সহযোগিতার কথা বললেও মি. 'কে' মানসিক শক্তিতে দুর্বল হওয়ায় এ প্রস্তাবে উজ্জীবিত না হয়ে বরং নিজেই নিদ্রামগ্ন হয়ে পড়েন।
কাফকার একটি ছোটগল্প 'অবিবাহের বিড়ম্বনা'। এ গল্পে কাফকা চরিত্রের মুখ দিয়ে পাঠকদের লক্ষ্য করে বলেছেন, 'যখন অসুস্থ হয়ে পড়বেন, একা একাই শূন্য ঘরে অলসভাবে বিছানায় পড়ে থাকতে হবে এবং এইভাবে আপনার সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে যাবে।' এ বয়ানে আমরা কাফকার নিজের জীবনের আক্ষেপকে উচ্চারিত হতে দেখি। পত্নীহীন জীবনে রুগ্নতার নিঃস্বার্থ সঙ্গী পাওয়া কঠিন, এ সত্য আসলে শুধু কাফকার জীবনের কথা নয়, এটা মানবজাতির জন্যও সত্য বটে। কাফকার অসমাপ্ত 'দুর্গ' উপন্যাসে শহরের মেয়রের একটা চরিত্র তিনি সৃজন করেছেন যিনি ব্যবহারে বন্ধুত্বপূর্ণ, আকৃতিতে স্থূলকায় এবং মুখ তার গোঁফ-দাড়ি কামানো। স্থূলতা মানুষের সুস্থতার একটা বিরাট অন্তরায়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্থূলতা হলো একধরনের অপুষ্টিজনিত রোগ এবং এ দৈহিক স্থূলতা উচ্চ রক্তচাপ ও মধুমেহ রোগের আকর। কাজেই কাফকা শহরের মেয়রকে স্থূল বলার সঙ্গে সঙ্গেই পাঠক তার শারীরিক অসুখ সম্পর্কে সম্যক ধারণা করতে পারে। এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মি. কে। তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া ছিল মেয়রের কাজ। কাফকা সজ্ঞানে এ মেয়রকে গাউটের রোগী হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বিছানায় শয্যাশায়ী অবস্থাতেই কে. নামের কথিত ভূমি জরিপকারীকে স্কুলের দপ্তরীর চাকরিতে যোগদানের প্রস্তাব দেন।
গাউট হলো গিঁটে বাত যাতে রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। কাফকা মেয়রকে গাউটের রোগী হিসেবে চিত্রিত করে নিজের শারীরিক রুগ্নতাকে চরিত্রের মধ্যে প্রতিবিম্বিত করেছেন। 'বিচার' শীর্ষক আরেকটি অসমাপ্ত উপন্যাসে কাফকা জোসেফ নামে এক বিচারাধীন ব্যক্তির বয়ানে যৌন নিপীড়নের কথা উল্লেখ করেছেন। একজন নারী ধোপা আদালতের নিকটবর্তী কোন বাড়িতে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। এ কারণে আদালতে বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। কাফকা তার একাধিক সৃষ্টিতে যৌন নিপীড়নকে চিত্রায়িত করেছেন। এ প্রবণতা আমাদেরকে সমাজের বিকৃত মনোবৃত্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। এমনিতেই সংস্কৃতিগতভাবে ইউরোপের দেশগুলোতে অবাধ যৌনাচার সমাজ কর্তৃক অনুমোদিত। তা সত্ত্বেও যখন সেই সমাজে যৌন নিপীড়ন তথা ধর্ষণ আলোচিত হয়ে দাঁড়ায় তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না, মনোবৃত্তিক বিকৃতি কতটা আগ্রাসী হয়ে উঠেছে।
'আমেরিকা' নামক অসমাপ্ত এ উপন্যাসের আখ্যানে ১৬ বছর বয়সী একজন ইউরোপীয় অভিবাসী কার্ল রোসম্যানের কথা আমরা জানি যে একজন গৃহপরিচারিকা কর্তৃক যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কলঙ্ক থেকে বাঁচতে নিউইয়র্ক সিটিতে যেতে বাধ্য হয়। এখানেও যৌন নিপীড়ন সামাজিক অস্থিরতার প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়ায়। 'বিচার' উপন্যাসে নারী এবং 'আমেরিকা' উপন্যাসে পুরুষের যৌন নির্যাতিত হওয়ার ঘটনায় এটা পরিষ্কার হয়, যৌনতার বিকৃতি উভয় লিঙ্গের জন্য হুমকি। পাশাপাশি 'আমেরিকা' উপন্যাসটির প্রথম পর্ব 'দ্য স্টোকার' এ জানা যায়, লিফট-বয় রবিনসন মাতাল ও অসুস্থ ছিলেন। এখানেও কাফকা অসুস্থতাকে যেন চরিত্রের মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে পেরে এক ধরনের স্বস্তির আস্বাদ পেতে চেয়েছেন। অথচ পশ্চিমা দেশে অ্যালকোহল সেবন স্বাভাবিক। তথাপি লিফট-বয় রবিনসনকে মাতাল বলে কাফকা তার চারিত্রিক শান্তি টুটিয়ে দিয়েছেন। কাফকার অন্যতম সৃষ্টি ডেলামার্চ চরিত্রটিকে তিনি একদিকে যেমন স্থূলকায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন, তেমনি অন্যদিকে তাকে অসঙ্গত যৌনাচারেও প্রকট করে দেখিয়েছেন। কম বয়সী কার্লকে ডেলামার্চ দাস হিসেবে নিতে চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হলেও তাকে শারীরিকভাবে ব্যবহৃত হতে বাধ্য করে।
কাফকার একটি বড় গল্পের নাম 'একটি সংগ্রামের বর্ণনা'। এটি তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত। গল্পের দ্বিতীয় অধ্যায়টি সবচেয়ে দীর্ঘ এবং এটি নিজেই আরও কয়েকটি বিভাগে বিভক্ত। এ অধ্যায়েও একজন অসাধারণ মোটা লোকের কথা বলা হয়েছে। দৈহিকভাবে মোটা মানেই অসুখী। 'একজন পল্লি চিকিৎসক 'গল্পে এক ডাক্তার তুষার পড়া শীতের রাতে দশ মাইল দূরে একটা গ্রামে একজন অসুস্থ রোগীকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে যান। যাকে তিনি চিকিৎসা দেন, তার ডান হাতের তালুতে একটা অদ্ভুত ক্ষত ছিল। কাফকা কর্তৃক বর্ণিত এ অদ্ভুত ক্ষত মুখ্যত তার মনে বিদ্যমান ক্ষতেরই বাহ্যিক রূপ।
'ব্যাচেলর এর কপাল' গল্পে ব্যাচেলরকে অসুস্থ দেখানো হয়েছে যার দেখভাল করার কেউ নেই। অর্থাৎ অসুস্থ ব্যাচেলরও স্বস্তিতে নেই। 'ব্যবসায়ী' ছোট গল্পে কেন্দ্রীয় চরিত্রটিকে মানসিকভাবে নিঃসঙ্গ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কাফকার বিখ্যাত রচনা 'দ্য মেটামরফোসিস ' বা রূপান্তরের গল্পে গ্রেগর সামসা হুট করে দৈত্যাকার গুবরে পোকায় পরিণত হয়ে যায়। এ রূপান্তরে গ্রেগর সামসার খাওয়ার রুচি বা আগ্রহ দূর হয়ে যায়। অর্থাৎ তার অ্যানোরেক্সিয়া দেখা দেয় যা পুষ্টিহীনতা তৈরি করে। অবশেষে দৈত্যাকার গুবরে পোকাটি মারা যায়। গ্রেগর সামসার পরিণতি ঠিক যেন কাফকার পরিণতি হয়ে দাঁড়ায়। কাফকা গ্রেগরকে গল্পের এক পর্যায়ে মূর্ছা যেতে দেখিয়েছেন। মূর্ছা যাওয়া বা সিনকোপাল অ্যাটাক মূলত অসুস্থতার একটি উপসর্গ। হতে পারে তা পুষ্টিহীনতা থেকে কিংবা রক্তস্বল্পতা থেকে। অর্থাৎ এখানেও কাফকা গ্রেগর হতে স্বস্তি কেড়ে নিয়ে নিজের পরাবাস্তবিক ভয়ানক চিন্তার বাস্তব রূপ দান করেছেন। কাফকার 'অসুখ' গল্পটি শুরু হয় কথকের ঘরের অভ্যন্তরে একটি বিভ্রান্ত, বিশৃঙ্খল দৃশ্য দিয়ে। উনিশশো দশ খ্রিষ্টাব্দে কাফকা 'অসুখ' শিরোনামে ছোটগল্পটি রচনা করেন। গল্পের নায়কের মাঝে কাফকা তার নিজের জীবনকে চিত্রিত করে তোলেন অনেকটাই। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র নভেম্বরের কোন এক সন্ধ্যায় উপলব্ধি করে, তার কাছে সবকিছু অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
ফ্রানৎস কাফকা এক অসাধারণ কালজয়ী এবং প্রভাবশালী সাহিত্য নির্মাতা যিনি ৪১ বছর বয়সে অকাল মৃত্যুকে বরণ করলেও তার সৃজনশস্যে তিনি দাপটের সাথে শতবর্ষ বিরাজ করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরও করবেন। অসুখ নিয়ে তিনি ভুগেছেন যেমন, তেমনি অসুখ নিয়ে তিনি লিখেছেনও। কাফকার অসুখেরা তার জীবন ও সাহিত্য পেরিয়ে আজ মানুষের গবেষণার প্রতিপাদ্যে পরিণত হয়েছে। এ গবেষণাই কাফকাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত করবে নিত্য নূতন আবিষ্কার দিয়ে।