প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সুইস ব্যাংক শাখা খুলতে চায় বাংলাদেশে— এমন সংবাদে সরকার, অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। উন্নত রাষ্ট্র সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি এতদিন আলো-ছায়ার বাতাবরণে ছিল। কত রহস্য গল্প রচিত হতো ব্যাংকটির নাম উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই। কালো টাকার মালিক, অবৈধ সম্পদের জোগানদার, ক্ষমতা অপব্যবহারের মাধ্যমে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বানিয়েছেন, গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়— বাংলাদেশের এ শ্রেণির লোকজন এদ্দিন গোপনে টাকা জমা রাখতেন সুইস ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে। এমন পাচারকাণ্ডের বড় একটি অংশে সংশ্লিষ্টদের নজরদারি তো ছিলই, এমনকি কারও কারও ক্ষেত্রে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গ। সুইস ব্যাংক যদি বাংলাদেশে শাখা খোলার অনুমতি পায়, সেক্ষেত্রে আমানতদারীরা বিপাকে পড়বেন কিনা, মসজিদের মুসল্লি, মাজারের ভক্ত ও আত্মীয়স্বজনের কাছে তাদের ইমেজ ক্ষুণ্ণ হবে কি না, তাদের তাবত ধনসম্পদ রাষ্ট্রীয়ভাবে বাজেয়াপ্ত হবে কি না— এমন প্রশ্নও গুঞ্জরিত হচ্ছে ফাইভ স্টার হোটেলের বিলাসী বাসিন্দা থেকে শুরু করে বস্তিতে আত্মগোপনে থাকা বিশিষ্ট সন্ত্রাসীদের মধ্যেও।
সুইস ব্যাংক বাংলাদেশ (এসবিবি) শাখায় সিসি ক্যামেরা লাগানো থাকবে, সিসি ক্যামেরা ফুটেজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পৌঁছাবে— এমন আশঙ্কাজনিত লুকোছাপাও ক্রমশ ডালপালা মেলছে মাফিয়া, কালোবাজারিসহ কালো টাকাওয়ালাদের মনে। সেক্ষেত্রে বর্তমানের মতোই নানা চোরাগোপ্তা পথ অবলম্বন করে কেন্দ্রীয় সুইস ব্যাংকে টাকা জমা রাখার সুযোগ বলবৎ থাকবে কিনা— এমন দোলাচলে চাপা আতঙ্কে ভুগছেন টাকার পাহাড় গড়ে তোলা মালিক ও মালকিনরা। যদিও সুইস ব্যাংক বরাবরই গ্রাহকের নাম-পরিচয় গোপন রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমন গোপনীয়তার মধ্যেও ব্যাংকটির অ্যাকাউন্টধারী বড় একটি অংশ আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করে গড়ে তুলেছেন একটি সংগঠন— 'আমরা সবাই ভাই ভাই, সুইস ব্যাংকে টাকা জমাই'। শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ ও ধুলো দেওয়া চোখে উজ্জ্বল ইমেজ প্রতিষ্ঠাকারী ব্যক্তিরা সঙ্গত কারণেই এ সংগঠনের সদস্য হননি। নিরাপত্তাজনিত কারণের বাইরেও তারা এসব 'চুনোপুঁটি'র সঙ্গে এক কাতারে সামিল হতে অনিচ্ছুক। তুলনামূলক কম ক্ষমতাধর অ্যাকাউন্টধারীরা দেশটির সরকারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন— অ্যাকাউন্টধারী সবাইকে সুইজারল্যান্ডের নাগরিকত্ব দেওয়া হোক। বিনিয়োগকারীরা নানাবিধ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা, বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখ ফাঁকি দিয়ে অন্য দেশে গোপনে হাজার-কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটানোর খবর ফাঁস, কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি কেনার বিষয়টিকে বিতর্কিত করে তোলার বিষয়গুলো ভালো চোখে দেখছেন না তারা। নিজের দেশকে ফুটো করে সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তুলতে নিয়ত অবদান রেখে চলেছেন যারা, তাদের মহানুভবতাকে অবশ্যই আমলে নেওয়া উচিত। সুইস সরকার নিশ্চয়ই সম্মানজনক নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভাববে।
সুইস সরকারের কাছ থেকে ইতি বা নেতিবাচক কোনো জবাব আসেনি এখনও। এমন দোদুল্যমান পরিস্থিতিতে সুইস ব্যাংক বাংলাদেশে শাখা খোলার চিন্তা করছে— এটাকে সঠিক পন্থা ও প্রাইভেসিবান্ধব বলে মনে করছেন না গোপন অ্যাকাউন্টধারীরা। কী হতে যাচ্ছে তবে আগামীতে! মিশ্র ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই অর্থনীতিবিদরা বলছেন ভিন্ন কথা। বিশেষ করে অনর্থনীতিবিদরা মতামত প্রকাশ কেেছন— কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমান্তরালে সুইস ব্যাংক শক্ত 'প্রতিপক্ষ' হয়ে উঠবে না তো! সুইস ব্যাংকেই যদি লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে যায় দেশে দুর্নীতি ও অপরাধ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় কিনা— এমন চাপা আতঙ্কও চাউর হচ্ছে বুদ্ধিজীবীপাড়ায়। অন্যদিকে ইতিবাচক দিক উল্লেখ করে দেশীয় অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভিনদেশি ব্যাংকে চোরাগোপ্তা পথে টাকা পাচার করতে সংশ্লিষ্টদের অনেক বেগ পেতে হয়। প্রক্রিয়াটা ঝুঁকিবহুল ও সময়-সাপেক্ষ। সেক্ষেত্রে স্বদেশেই যদি স্থাপিত হয় আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় ব্যাংকটির শাখা, দুর্নীতিবাজরা আরও মনোযোগ দিয়ে অনৈতিক পন্থায় টাকা অর্জন করতে পারবেন। ফুলে-ফলে আরও বিকশিত হয়ে উঠবে প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক অর্থনীতি।
শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের এমন দাবিকে নাকচ করে দিয়ে 'ক্রেতাধিকার সমন্বয় সংস্থা' বলছে, এর মাধ্যমে মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে। জনজীবনে পড়বে বিরূপ প্রভাব। এমনিতেই তেল, চাল, আলু, পেঁয়াজ, ডিম থেকে শুরু করে গায়ে মাখার সাবানের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে, লুটপাটের সুযোগ অবারিত হলে, ছদ্ম-বৈধতা দিলে ভেঙে পড়তে পারে বাজারব্যবস্থা। ঊর্ধ্বতনরা দফায় দফায় পণ্যমূল্য নির্ধারণ করে দিলে, বাজারে লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করা হলেও কোনো কাজে আসবে না। তখন কারওয়ান বাজারে দাঁড়িয়েও অনুভব করা যাবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের আছড়ে পড়া ঢেউ। বলাবাহুল্য, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি ভেসে যাবে এমন স্রোতে। তারপর ঢুকে যাবে হাঙরের ভয়াল হা-য়ে!
নানামাত্রিক জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের একটি অংশ বিবৃতি দিয়েছেন— 'আমরা প্রাণান্ত পরিশ্রম করে দেশে রেমিটেন্স পাঠাই। অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকের পিলার ধরে লম্ফঝম্প করেন কারা, কেন, কোন স্বর্ণসময়ে— এটা কোন টেন্স? এটা কি মিশকালো অধ্যায় নয়? দূর হোক অন্ধকার অতীত, মৃত্যু ঘটুক ব্ল্যাক পাস্ট টেন্সের...।'
প্রবাসী শ্রমিকদের উত্থাপিত এমন প্রশ্নের জবাব তির্যকভাবে দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধূসর দলের শিক্ষকরা। সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে তারা বলেছেন— 'কালো যদি অন্ধকারের প্রতীক হয়, লাল হচ্ছে রক্তের প্রতীক। অনেক হয়েছে এবার মানে মানে ক্ষমতা ছাড়ুন। বিরোধী দলকেও ক্ষমতার স্বাদ দিন। ভাগাভাগি করে খাওয়া সবারই গণতান্ত্রিক অধিকার। ভুলে যাবেন না, সুইস ব্যাংকে টাকা জমানোর অধিকার বিরোধী থেকে শুরু করে সব দলেরই আছে। অনেক বছর যাবত বিরোধী দলের শীর্ষ নেতা থেকে শুরু করে ছাত্র, যুব ও পেশাজীবী সংগঠনের ছেলেপেলেরাও রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। তাদের চেহারা হয়ে যাচ্ছে সাদা কাগজের মতো। যে কাগজের মূল্য আপনারা অন্যায়ভাবে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছেন। এদিকে আমরা— শিক্ষকরাও কতকাল রাষ্ট্রপতি হই না! আপনাদের সাধ-আহ্লাদ আছে, আমাদের কি কিছুই থাকতে পারে না? নিদেনপক্ষে সুইস ব্যাংকে একটা অ্যাকাউন্ট, উঁচু বেষ্টনী ও পাহাদারওয়ালা বড় একটি বাড়িতে থাকার সুযোগ...।'
গুঞ্জন, চাপা উত্তেজনা ও প্রতিবাদের ডালপালা আরও উঁচুতে উঠতে থাকলে সুইস অর্থমন্ত্রী বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি বলেন— এসবিবি শাখা খবরটির বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। আপাতত এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না সুইস ব্যাংক। তবে যে বা যারাই গুজবটি ছড়িয়ে থাকুন, তাদের ধন্যবাদ জানাই। আইডিয়াটি ভালো। সুইস ব্যাংক অদূর ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই বাংলাদেশে শাখা খোলার উদ্যোগ নেবে। যে দেশের একশ্রেণির মানুষ নিজের মাকে দিগম্বর রেখে হলেও টাকা জমাতে চায় সুইস ব্যাংকে, নিজ দেশের চেয়েও বেশি ভালোবাসে সুইজারল্যান্ডকে, সে দেশের আমানতদাররা অবশ্যই আমাদের বড় গ্রাহক। তাদের প্রতি সুইস সরকার রাষ্ট্রপ্রধানেরও দায় রয়েছে। বাংলাদেশিরা আমাদের ভিআইপি গ্রাহক। এ একটা কারণে হলেও সুইস ব্যাংক শাখা খুলতে চায় বাংলাদেশে। আমরা শ্রেষ্ঠ গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা দিতে চাই।
সুইস অর্থমন্ত্রীর এমন ভাষ্যের পরদিনই জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকগুলো সংবাদ শিরোনাম প্রকাশ করল— অবশেষে সুইস ব্যাংক আসছে বাংলাদেশে : দুর্নীতিবাজদের মনে আনন্দের ফল্গুধারা!