
বন্দর নগরী চট্টগ্রামে মিশে হাজার বছরের ঐতিহ্য ও আদি সাংস্কৃতিক নিদর্শন। যা জ্ঞান পিপাসু পর্যটক, ইতিহাসবিদ ও নতুন প্রজন্মের জন্য মহা মূল্যবান রত্ন সমতূল্য। এ নগরীতে আরব, পর্তুগিজ ও তৎকালীন রাজবংশের গুরুত্বপূর্ণ শাখা বিস্তৃত ছিল। যা চট্টগ্রামকে ইতিহাসের পাতায় অনন্য অবস্থানে রেখেছে। এ বিষয়টিকে আরও সমুন্নত করার লক্ষ্যে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণে এবার বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (সিএমএমপি) ২০২৫-২০৫০-এ প্রথমবারের মতো নগরের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, প্রত্নসম্পদ ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন সংরক্ষণের জন্য পৃথক নীতিমালা, আইনি সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন কৌশল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খসড়া মহাপরিকল্পনায় চট্টগ্রাম মহানগর ও আশপাশের এলাকায় মোট ১০৭টি হেরিটেজ সাইট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্থাপনা ও স্থানকে সংরক্ষণ, নথিভুক্তকরণ, অননুমোদিত পরিবর্তন রোধ এবং পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই খসড়া পরিকল্পনার ওপর ২ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিনব্যাপী জনমত গ্রহণ করছে সিডিএ। পরিকল্পনাবিদদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, পাহাড় কাটা এবং বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের কারণে চট্টগ্রামের বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নতুন মাস্টারপ্ল্যানে সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে হেরিটেজ সংরক্ষণকে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খসড়া মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভবন, ধর্মীয় স্থাপনা, ঔপনিবেশিক আমলের ভবন এবং প্রত্নসম্পদ আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকাভুক্ত করে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হবে। এসব স্থাপনা ভাঙা, অননুমোদিত সংস্কার কিংবা আশপাশের জমির ব্যবহার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, কোনো হেরিটেজ ভবনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে এমন সংস্কার বা পরিবর্তন অনুমোদন করা হবে না। একই সঙ্গে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও রাখা হবে। এতে বলা হয়েছে, হেরিটেজ স্থাপনার পাশের এলাকায় নতুন কোনো ভবন নির্মাণ করতে হলে এমন নির্মাণ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, যাতে কম্পন বা অন্য কোনো কারণে ঐতিহাসিক স্থাপনার ক্ষতি না হয়। একই সঙ্গে নতুন ভবনের উচ্চতা, নকশা ও অবস্থান এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর দৃশ্যমানতা ও নান্দনিকতা নষ্ট না হয়। হেরিটেজ সংরক্ষণে মালিকদের আর্থিক ক্ষতি কমাতে মাস্টারপ্ল্যানে ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস (টিডিআর) ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো হেরিটেজ স্থাপনার মালিক যদি সংরক্ষণের স্বার্থে জমিতে অতিরিক্ত উন্নয়ন করতে না পারেন, তাহলে সেই অব্যবহৃত উন্নয়ন অধিকার অন্য এলাকায় স্থানান্তর বা বিক্রির সুযোগ পাবেন। এতে ঐতিহ্য রক্ষা এবং মালিকের অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হবে। মাস্টারপ্ল্যানে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ও নিদর্শনের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল রিপোজিটরি গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আর্কিওলজিক্যাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট (প্রত্নতাত্ত্বিক প্রভাব মূল্যায়ন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে, যাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা বা প্রত্নসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ঐতিহ্য সংরক্ষণকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করতে মাস্টারপ্ল্যানে হেরিটেজ ট্রেইল, তথ্যসমৃদ্ধ সাইনেজ, ওয়াকিং ট্যুর এবং দর্শনার্থীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। মাস্টারপ্ল্যানের পরিশিষ্টে চট্টগ্রাম মহানগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ১০৭টি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে নগরীর আন্দরকিল্লা ও চকবাজার এলাকায় রয়েছে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ, কদম মোবারক মসজিদ, চন্দনপুরা মসজিদ, আদালত ভবন, সিআরবি কমপ্লেক্স, পুরোনো সার্কিট হাউস (বর্তমান জিয়া স্মৃতি জাদুঘর), চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল এবং বটতলী রেলওয়ে স্টেশন। ধর্মীয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের স্থানের মধ্যে রয়েছে বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.)-এর মাজার, চশমা-ই-শেখ ফরিদ, শাহ কাতাল মাজার, ইউরোপীয় কবরস্থান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাধিক্ষেত্র। হাটহাজারী এলাকায় রয়েছে ফতেহাবাদ মডেল হাই স্কুল, নসরত শাহের দিঘি ও মসজিদ, আলাওল মসজিদ। এছাড়া আনোয়ারা, সীতাকুণ্ড, পটিয়া ও রাউজানে অবস্থিত বিভিন্ন প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধ বিহার, জমিদার বাড়ি এবং মাস্টারদা সূর্য সেন স্মৃতিসৌধকেও হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কর্ণফুলী নদীর তীর এবং আশপাশের পাহাড়ে ছড়িয়ে থাকা সুলতানি, মুঘল ও ঔপনিবেশিক আমলের বহু নিদর্শন পর্যটন সম্ভাবনাময় সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ ও উন্নয়নের আওতায় আনা হবে। সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন বলেছেন, এটি চট্টগ্রামের চতুর্থ মহাপরিকল্পনা। অতীতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার নাগরিকদের মতামতের ভিত্তিতেই পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করা হবে। উন্নয়নের পাশাপাশি চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করাই নতুন মহাপরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।