ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বাঁশখালীতে অবৈধ ৩ শতাধিক করাতকল, গিলে খাচ্ছে বনের গাছ

বাঁশখালীতে অবৈধ ৩ শতাধিক করাতকল, গিলে খাচ্ছে বনের গাছ

চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীতে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে তিন শতাধিক অবৈধ করাতকল (স' মিল)। কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র ও পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে চলা এসব করাতকলে দিন-রাত কাটা হচ্ছে কাঠ। আর এর জেরে উজাড় হচ্ছে উপকূলীয় সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও সামাজিক বনায়নের লাখ লাখ টাকার গাছ।

স্থানীয় পরিবেশবাদীরা জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করায় জ্যামিতিক হারে বাড়ছে করাতকল। অথচ বন বিভাগের নীতিমালায় রয়েছে, সংরক্ষিত বনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন করা যাবে না। করাতকল চালাতে হলে প্রয়োজন হবে লাইসেন্স। কিন্তু এসব নিয়মনীতি মানেন না বাঁশখালীর করাতকল মালিকরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, করাতকল (লাইসেন্স) বিধিমালা-২০১২ এর ৭ ধারা অনুযায়ী সংরক্ষিত বনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো করাতকল স্থাপন করা যাবে না। অথচ বাঁশখালীর পুকুরিয়া, সাধনপুর, কালীপুর, বৈলছড়ী, জলদী, চাম্বল, পুঁইছড়ী, সহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বনের সীমানা ঘেঁষেই বসানো হয়েছে এসব অবৈধ স মিল। এমনকি অনেক স্থানে প্রধান সড়কের পাশে ও লোকালয়ের ভেতরে বসানো এসব করাতকলের কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শব্দ ও পরিবেশ দূষণ চরম আকার ধারণ করেছে। এসব করাতকলের মালিকরা সুকৌশলে গিলে খাচ্ছে স্থানীয় বন। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রিজার্ভ ফরেস্ট।

সরেজমিন দেখা যায়, পৌরসভার সংরক্ষিত বনের ৩ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে অর্ধডজন করাতকল। ৫ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে আরও ৮-১০টি করাতকল। করাতকলগুলো স্থাপন করা হয়েছে লাইসেন্স ছাড়াই। লাইসেন্সবিহীন এসব করাতকলে দিন-রাত দেদারছে চলছে সংরক্ষিত বনের চোরাই কাঠ চেরাই। অবৈধ এসব করাতকলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলসহ উপকূলীয় বাঁধ রক্ষা, সামাজিক বনায়নের গাছ অহরহ চেরাই চলছে। ফলে উপকূলীয় বনাঞ্চল এখন চরম হুমকির মুখে রয়েছে। গত একযুগে উপকূলের বেড়িবাঁধ রক্ষায় সৃজিত হাজার একর বনাঞ্চল উজাড় হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।

সরল ইউনিয়নের বাসিন্দা হোসাইন, বাহারছড়া রত্নপুর এলাকার বাসিন্দা মো. রাসেল বলেন, প্যারাবন উজাড় হওয়ায় উপকূলের বেড়িবাঁধগুলো চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দূর্যোগকালীন ঝুঁকিতে থাকে উপকূলের মানুষ। কালীপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল কালাম জানান, পাহাড় বেষ্টিত কালীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন জায়গায় একাধিক করাতকল রয়েছে। এসব করাতকল থেকে বনাঞ্চলের দূরত্ব খুবই কম। আর অবৈধ এসব করাতকলে চলছে গাছ চেরাইয়ের মহোৎসব।

চাম্বল ইউনিয়ন পরিষদের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান মো. শহীদুল্লাহ জানান, যে যার মতো যেখানে সেখানেই স্থাপন করছে করাতকল। ইতোমধ্যে আমার ইউনিয়নে প্রায় এক ডজন করাতকল স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু এসব করাতকল থেকে বনাঞ্চলের দুরত্ব খুবই কম। পুইছুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান তানজিম জানান, পাহাড় বেষ্টিত পুইছুড়ি ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেঁষেই আবর শাহ বাজারে স্থাপন করা হয়েছে বেশ কয়েকটি করাতকল। তাছাড়া প্রেম বাজার, বদ্দারহাট ও নাপোড়া এলাকায় একাধিক করাতকল রয়েছে। অথচ এসব করাতকল থেকে পুঁইছুড়ি ও নাপোড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলের দুরত্ব মাত্র এক কিলোমিটার। সরকারি নিয়ম কানুন তোয়াক্কা না করে এসব করাতকল স্থাপিত হয়েছে। আর অবৈধ এসব করাতকলে চলছে গাছ চেরাইয়ের মহোৎসব। যার মাধ্যমে খুব সহজেই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গাছ চলে যাচ্ছে উপকূলের বিভিন্ন উপজেলায়।

বাহারচড়া রত্নপুর ও গন্ডামারা সদর উপকূলীয় বিট কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, বন আইন অনুযায়ী কোনো করাতকল মালিক লাইসেন্স না নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন না। লাইসেন্স নেওয়ার পর প্রতিবছর নবায়ন করতে হবে। করাতকল স্থাপনের জন্য বন বিভাগের লাইসেন্স পাওয়ার পর পরিবেশ অধিদপ্তর থেকেও ছাড়পত্র নিতে হয়। আমি ২টি বিটের দায়িত্ব রয়েছি। তারমধ্য গন্ডামারা বিটের অধীনে জলদী, সরল, কাথরিয়া, গন্ডামারা ও শেখেরখীলের অধীনে ২৭ টা। রত্নপুরের বিটের অধীনে বাহারছড়া, কালীপুর, সাধনপুর বানীগ্রাম ও খানখানাবাদ ইউনিয়নের অধীনে ২৮ টা। কোন করাতকলের বৈধ কোন কাগজপত্র কারো নাই। যারা অবৈধভাবে করাতকল পরিচালনা করে আসছে তাদের বিষয়টি কতৃপক্ষ কে অবহিত করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বাঁশখালী উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা খায়রুল আলম বলেন, করাতকলের বিষয়ে আমি অবগত নই, এসব করাতকল গুলো দেখবাল করেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন কালীপুর রেঞ্জ অফিস।

জলদী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ কর্মকর্তা ইসরাঈল হক বলেন, জলদী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জ হতে করাতকল বিষয়ক কোনো কর্যক্রম পরিচালনা করা হয় না। শুধুমাত্র বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত কাজ দেখাশোনা করা হয়। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বনবিভাগ কালীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, কালীপুর রেঞ্জের আওতাধীন বনবিটের অধীনে কত করাতকল রয়েছে আমি অবগত নই। আমি সবেমাত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এরইমধ্যে এসব অবৈধ করাত কলের হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করার কাজ চলমান রয়েছে। খুব শিগগিরই কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে জানানো সহ অবৈধ এসব করাতকলগুলো বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপকূলীয় বন বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম এ হাসান বলেন, এরইমধ্যে বাঁশখালী পিএবি প্রধান সড়কের পশ্চিম পাশে স্থাপিত সকল বৈধ ও অবৈধ ভাবে পরিচালিত করাতকলের হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (এচঝ রিডিং) সহ করাতকলের অবস্থানের তথ্য সংরক্ষণ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খুব শীগ্রই অবৈধ করাতকলগুলো বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তারা জানান, সংগঠনটি চারটি প্রধান প্রকল্প নিয়ে কাজ করবে— আবাসন, স্কিল ডেভেলপমেন্ট, মেডিকেল সেবা ও প্রাণিসেবা। আবাসন প্রকল্পে প্রথম ধাপে ২০৬টি আবেদনের মধ্য থেকে ২০২৫ু২৬ শিক্ষাবর্ষের ১০ শিক্ষার্থীকে নির্বাচন করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীরা যাতে নিজেদের আবাসনের ব্যবস্থা নিজেরাই করতে পারেন, সে ধরনের সহযোগিতার পরিকল্পনাও রয়েছে। স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে সিভি লেখা, চাকরির আবেদন, এআই টুলের ব্যবহার ও মৌলিক কম্পিউটার দক্ষতার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিসিএস, আইইএলটিএস ও উচ্চশিক্ষা বিষয়ে সেমিনার আয়োজন করা হবে। মেডিকেল সেবা প্রকল্পে প্রতি মাসে বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্প এবং আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাণিসেবা প্রকল্পে ক্যাম্পাসের কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর খাবার, পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা করা হবে। উদ্যোক্তারা বলেন, ছোট ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছে। এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন তারা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত