প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অভ্যাস ছিল প্রতিদিন ফজর সালাতের পর তিনি মসজিদে নববির একটা খুঁটির গোড়ায় বসতেন। তার চারপাশে বিভিন্ন সাহাবি, অমুসলিম, যাযাবররা ভিড় জমাতেন। প্রথম প্রথম তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসলেও রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কেন্দ্র করে চারপাশে বৃত্তাকারে বসার আদব শিখালেন নবীজি। এরপর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধর্মীয় জ্ঞানার্জন করতেন, জীবন ঘনিষ্ঠ প্রশ্নের উত্তর জানতেন, পরামর্শ চাইতেন, নানা বিষয়ে তালিম নিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ক্লাস ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। সমাজের যেকোনো স্তরের মানুষেরা তাতে অংশগ্রহণ করতে পারতেন। বিশেষ করে আসহাবুস সুফফার ৬০/৭০ জন শিক্ষার্থী সারাক্ষণ জ্ঞানার্জনে মসজিদে নববীতে অবস্থান করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছাকাছি থাকতেন। ফলে তাদের প্রত্যেকের মধ্যে তাকওয়া (ভরসা), ইয়াকিন (বিশ্বাস) ও ইলমের (জ্ঞান) ঈমানের অপূর্ব সমন্বয় ছিল। যা অন্য সকল স্টুডেন্ট থেকে তাদের অবস্থান আলাদা করেছিল।
নববী দারস চলাকালীন কেউ উঠতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে অনুমতি নিয়ে ওঠার আদেশ ছিল নবীজির। যখনই নতুন কোনো শিক্ষার্থী দারসে আসতেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) হাসিমুখে বিভিন্ন উৎসাহমূলক বাক্য দ্বারা স্বাগত জানাতেন। যেমন : ইলম অন্বেষণকারীকে স্বাগতম। ইলম অন্বেষণকারীকে ফেরেশতারা ডানা দিয়ে দিয়ে ঘিরে রাখেন। কখনও কখনও এই শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেড়ে ১৫০/২০০/৪০০ পর্যন্ত হতো। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন দরস দিতেন তখন প্রথম কাতারের ব্যক্তিরা যেভাবে বুঝতেন অনুরূপ মজলিসের শেষ কাতারের শিক্ষার্থীরাও বুঝতেন। যেসব সাহাবি জীবিকা নির্বাহের জন্য দরস মিস করতেন, অন্য সাহাবিদের দায়িত্ব ছিল দারসের আলোচনা তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার।
এক বয়স্ক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, আমার অন্তর শক্ত হয়ে গেছে, জিহ্বা আড়স্ট হয়ে গেছে, বয়স বেড়ে গেছে আমাকে কোরআন শিক্ষা দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে সুরা জিলজাল পাঠ করার আদেশ করলেন। অন্য একদিন একটা যুদ্ধের জন্য সৈনিকদের একত্রিত করে সবার থেকে কোরআন শুনলেন। যে যেটুকু পারে তা ব্যাক্ত করার পর একজন অল্পবয়সী সাহাবি সুরা বাকারা সম্পূর্ণ শুনালে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকেই সেনাপ্রধান বানালেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন আলোচনা শুরু করতেন তখন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো তিনবার উচ্চারণ করতেন। যেন তা জ্ঞানে বসে যায়। স্পষ্ট এবং ধীরে ধীরে কথা বলতেন। সে সময় নৈশকালীন পাঠশালাও চালু ছিল। অনেক সাহাবি তাতে অংশগ্রহণ করতেন রাতভর ইলম অর্জন করে ফজর হলে জীবিকা উপার্জনে বেড়িয়ে পড়তেন। আনাস (রা.) বলেন তখন কেউ মিথ্যা বলত না। কেউ কাউকে ধোকা দিত না। হিংসা করত না।
সেই শিক্ষার্থীরা কতোই না সৌভাগ্যবান যাদের শিক্ষক হলেন স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে। সুবহানাল্লাহ। তিনি আমাদের মাঝে না থাকলেও তার উত্তরধিকারী হয়ে তার জ্ঞান মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। এই নববি দায়িত্ব শুধু সনদপ্রাপ্ত আলেমদের নয় বরং সবার।