ঢাকা সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ক্ষমতার পালাবদল থেকে রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচনের তাৎপর্য

মো. সাইদুর রহমান
ক্ষমতার পালাবদল থেকে রাষ্ট্র সংস্কার ও নির্বাচনের তাৎপর্য

২০২৪ সালের আগস্টে এক ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী লীগ শাসনের অবসানের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের যে গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছিল, তা এখন এক চূড়ান্ত পরীক্ষার মুখে। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দীন কর্তৃক ঘোষিত নির্বাচনি তফসিল শুধু একটি ভোটের তারিখ নয়, বরং এটি একটি জাতির শাসনতান্ত্রিক ও ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠনের রূপরেখা। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক ‘মহাবৈপ্লবিক পরীক্ষা’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই নির্বাচনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো- একই দিনে ‘জুলাই চার্টার’ বা জুলাই সনদের ওপর জাতীয় গণভোট হবে। এই সনদ মূলত ২০২৪-এর আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি প্রয়াস। যেখানে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা হ্রাস, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধের মতো মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্বাচনের সঙ্গে এই গণভোটের সংমিশ্রণ ইঙ্গিত দেয় যে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে একটি অধিকতর জবাবদিহিতামূলক সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে কাজ করতে হবে।

বর্তমান নির্বাচনি ময়দানে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এখন প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হেেয়ছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অনুপস্থিত থাকায় এবং তাদের সাংগঠনিক কাঠামো বিপর্যস্ত হওয়ায় বিএনপিকে অনেকেই সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখছেন। দলটির বর্তামন চেয়ারম্যান তারেক রহমান বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে তার রাজনৈতিক সক্রিয়তার জানান দিয়েছেন। অন্যদিকে, জুলাই অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) আদর্শিক সংকটে নিমজ্জিত। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে দলটিতে ভাঙন ধরেছে, যা নতুন রাজনৈতিক শক্তির স্থায়িত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এদিকে জামায়াত চাচ্ছে এই জোটের মাধ্যমে তাদের হারানো রাজনৈতিক বৈধতা ফিরে পেতে। তবে, আসন ভাগাভাগি নিয়ে এনসিপির সঙ্গে তাদের একটি টানাপোড়া চলছে। এদিকে, ভোটের উৎসবের মাঝেও অন্ধকার ছায়া ফেলছে দেশের অস্থির আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা অভিযোগ উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এছাড়া দেশজুড়ে গণপিটুনি বা ‘মব জাস্টিস’, ওসমান হাদিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের গুলি করে হত্যা। এসব ঘটনা সামগ্রিক বিচারহীনতার চিত্র তুলে ধরেছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে এক বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার সশস্ত্র বাহিনীকে বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদান করেছে, যার মেয়াদ ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচনের দিন অন্তত এক লাখ সেনাসদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও সেনাবাহিনী জানিয়েছে তারা নির্বাচনের পর ব্যারাকে ফিরে যাবে, তবে বেসামরিক প্রশাসনে তাদের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি এবং বিশেষ বিচারিক ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।

বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও এক বড় কম্পন সৃষ্টি করেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ (Neighborhood First) নীতির সংকটের মুখে পড়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোটের সম্ভাব্য বিজয় দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

তবে তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎ এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়ে বিএনপির ইতিবাচক অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, উভয় পক্ষই এক নতুন বাস্তবতায় কাজ করতে প্রস্তুত। ভারতের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো- বাংলাদেশে কট্টরপন্থিদের উত্থান মোকাবিলা করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি শুধু একটি নির্বাচনি দিন নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের পরীক্ষা। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে দেশকে কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে বের করে একটি সুস্থির গণতন্ত্রে পরিণত করতে।

নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে জুলাই চার্টারের বাস্তবায়ন, ভারতের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা, উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণ এবং সামরিক বাহিনীকে সফলভাবে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে একটি শক্তিশালী বেসামরিক প্রশাসন গড়ে তোলা। শহিদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই অভ্যুত্থান সার্থক হবে কি না, তা নির্ভর করছে এই গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সফলতার ওপর।

মো. সাইদুর রহমান

শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত