প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬
ডিজিটাল বিপ্লবের এই যুগে রিলস (Reels) হয়ে উঠেছে সবচেয়ে প্রভাবশালী যোগাযোগ ও বিপণন মাধ্যম। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওতে পণ্য বিক্রি, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড গড়া কিংবা রাতারাতি পরিচিতি- সবই সম্ভব হচ্ছে রিলসের মাধ্যমে। কিন্তু এই ঝলমলে সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর অন্ধকার দিক, যা ব্যক্তি, সমাজ ও ব্যবসা- সব ক্ষেত্রেই নীরবে ক্ষতি করে চলেছে।
রিলস মার্কেটিংয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ভাইরাল হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। কনটেন্ট নির্মাতারা ক্রমাগত ভিউ, লাইক ও ফলোয়ারের পেছনে ছুটছেন। এর ফলে সৃজনশীলতা নয়, বরং চমক, অতিরঞ্জন ও কখনও কখনও অসত্যই হয়ে উঠছে প্রধান হাতিয়ার। মানসিকভাবে অনেকেই ভুগছেন হতাশা, আত্মসম্মানহীনতা ও উদ্বেগে। একটি ভিডিও ভালো না চললেই নিজেকে ব্যর্থ মনে করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
অন্যদিকে, রিলস মার্কেটিং পুরোপুরি নির্ভরশীল প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদমের ওপর। আজ যে কনটেন্ট হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, কালই তা অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। এতে ছোট উদ্যোক্তা ও নতুন কনটেন্ট নির্মাতারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে গুণগত কনটেন্টের চেয়ে বিতর্কিত বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, যা একটি দায়িত্বশীল ডিজিটাল সংস্কৃতির পরিপন্থী।
রিলস মার্কেটিংয়ের আরেকটি ভয়ঙ্কর দিক হলো ভ্রান্ত ও অনৈতিক প্রচারণা। দ্রুত ফলের আশায় অনেক ব্র্যান্ড বা তথাকথিত ইনফ্লুয়েন্সার অতিরঞ্জিত ও অবাস্তব দাবি তুলে ধরছেন- যেমন অল্প সময়ে ওজন কমানো, দ্রুত ধনী হওয়ার কৌশল বা অলৌকিক সাফল্যের গল্প। এর ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, আর দীর্ঘমেয়াদে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।
এছাড়া রিলস জনপ্রিয়তা বেশিরভাগ সময়ই ক্ষণস্থায়ী। হাজার হাজার ভিউ বা ফলোয়ার থাকলেও তা সব সময় বিক্রি, বিশ্বাস বা টেকসই ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করতে পারে না।
জনপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে কনটেন্ট নির্মাতারা ক্রমাগত নতুন ভিডিও তৈরির চাপে পড়ছেন, যা এক ধরনের ডিজিটাল দাসত্বে পরিণত হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রিলসের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মনোযোগ ক্ষমতা ও গভীর চিন্তার অভ্যাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সংক্ষিপ্ত ও দ্রুতগতির কনটেন্টে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় মানুষ দীর্ঘ লেখা পড়া বা গভীরভাবে চিন্তা করার আগ্রহ হারাচ্ছে। এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের পথে বড় বাধা।
তবে রিলস নিজেই সমস্যা নয়; সমস্যা হলো এর অবিবেচনাপূর্ণ ও অনৈতিক ব্যবহার। প্রয়োজন দায়িত্বশীল কনটেন্ট নির্মাণ, বাস্তবসম্মত প্রচারণা এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া। রিলসকে যদি সচেতনভাবে ব্যবহার করা যায়, তবে এটি হতে পারে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যম। অন্যথায়, এই ডিজিটাল ঝলকানির আড়ালে আমরা হারিয়ে ফেলতে পারি আমাদের মূল্যবোধ, স্থিরতা ও মানবিক বোধ।
তাকিয়া তাবাচ্ছুম
শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়