ঢাকা সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

গুলির নগরী ঢাকা : নাগরিকের আতঙ্ক

সাদিয়া সুলতানা রিমি
গুলির নগরী ঢাকা : নাগরিকের আতঙ্ক

রাজধানী ঢাকা আবারও আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হচ্ছে। একের পর এক এলাকায় গুলির ঘটনা, সংঘর্ষ, বিস্ফোরণসদৃশ শব্দ এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতি নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দিন কিংবা রাত কোনো সময়ই আর নিরাপদ বলে মনে হচ্ছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুলির ভিডিও, রক্তাক্ত মানুষের দৃশ্য ও আতঙ্কিত জনতার আর্তচিৎকার সাধারণ মানুষের মনে গভীর ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। রাজধানীর মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরে এই পরিস্থিতি শুধু উদ্বেগজনক নয়, বরং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সক্ষমতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

ঢাকা শুধু একটি শহর নয়, এটি দেশের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এই শহরের নিরাপত্তাহীনতা মানে পুরো দেশের স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়া। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ হত্যা, সংঘবদ্ধ হামলা, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। পাড়া-মহল্লা, ব্যস্ত সড়ক, বাজার, এমনকি হাসপাতালের সামনেও গুলির ঘটনা ঘটছে যা সভ্য সমাজের জন্য এক ভয়াবহ বার্তা বহন করে।

সাম্প্রতিক ছয় মাসে রাজধানী যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সময়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি বড় অংশই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, অপরাধী গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, পাশাপাশি পুরনো ব্যক্তিগত শত্রুতার মতো কারণ সামনে আসছে। প্রতিটি ঘটনায় একটি বিষয়ই স্পষ্ট অবৈধ অস্ত্রের অবাধ ব্যবহার এবং অপরাধীদের বেপরোয়া মনোভাব।

এই সহিংসতার প্রভাব শুধু নিহত বা আহতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ধীরে ধীরে গ্রাস করছে নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবন, নিরাপত্তাবোধ ও মানসিক স্থিতি। শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী মানুষ, নারী ও শিশু সবাই এই আতঙ্কের শিকার। অনেক এলাকায় সন্ধ্যার পর দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে চায় না। যান চলাচল ব্যাহত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে পড়ে নেতিবাচক প্রভাব। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে অবিশ্বাস, অনিশ্চয়তা ও ভয় নাগরিক জীবনের অংশ হয়ে উঠছে।

পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সহিংসতা। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সহিংসতায় ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৬৮ জনের। এসব পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যাই নয়, এগুলো সমাজে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার একটি নগ্ন চিত্র তুলে ধরে। বিশেষ করে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ভোটের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই খুনোখুনি, দখল, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা যেন থামছেই না।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে এটি নতুন কিছু নয়। তবে এবার পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বেশি। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বলছে, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সারা দেশে ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২টি গোলাবারুদ লুট হয়। এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ সমাজে ছড়িয়ে পড়া মানে সহিংসতার বীজ বপন করা। যদিও ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে, তবুও এখনও পর্যন্ত ১ হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এই অস্ত্রগুলো কোথায়, কার হাতে সে প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর নেই।

এই লুট হওয়া অস্ত্রই এখন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, ডাকাতি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডে নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে, কারণ তাদের হাতে আছে প্রাণঘাতী অস্ত্র এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া। ফলে সাধারণ মানুষ শুধু অপরাধীর কাছেই নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার কাছেই নিজেকে অসহায় মনে করছে।

এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। শুধু তাৎক্ষণিক অভিযান বা ‘ক্রসফায়ার’ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতা, অপরাধের উৎস ও নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ।

সাদিয়া সুলতানা রিমি

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত