ঢাকা সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মেহমানদারিতে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ

আহমাদ বিন নুর
মেহমানদারিতে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ

আমি খুব গভীরভাবে বিস্মিত হয়ে পড়েছিলাম। আমার স্ত্রী কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। আমি তাকে বলেছিলাম- ‘দেখো, আমরা ইসলাম সম্পর্কে যা জানি, এই মানুষটা ঠিক সেটারই বাস্তব প্রমাণ।’ রোমানিয়ার একজন ভদ্রলোক, নাম ড. স্টিফেন। তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে ভ্রমণে গিয়েছিলেন তুরস্কে। ভ্রমণের এক পর্যায়ে তারা রাস্তা হারিয়ে ফেলেন। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। অচেনা জায়গা, কোথাও যাওয়ার পথ নেই, কার কাছে সাহায্য চাইবেন- কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

অবশেষে পাশের একটি বাড়িতে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লেন। একজন মানুষ বের হয়ে এলেন। তারা নিজেদের অসহায় অবস্থার কথা খুলে বললেন। বাড়ির লোকটি বললেন- ‘এই সময় আশপাশে কোনো হোটেল পাবেন না। আজকের রাতটা আপনারা আমার বাড়িতেই কাটিয়ে দিন।’

আর কোনো উপায় না থাকায় রোমানিয়ান দম্পতি রাজি হয়ে গেলেন। তাদের রাতের খাবার দেওয়া হলো। খাবার খুব সাধারণ- বাড়ির লোকজন যা খায়, অতিথিদেরও তাই দেওয়া হলো। বাড়িটিতে মোট পাঁচজন সদস্য ছিলেন। খাবার শেষে বাড়ির লোকটি বললেন- ‘আপনারা বিশ্রাম নিন। আমরা পাশেই আছি, প্রয়োজনে ডাকবেন।’

ড. স্টিফেন ও তার স্ত্রী তুরস্কের এক অজানা পল্লীতে সেই রাত কাটালেন। সকাল হলে ড. স্টিফেন বাড়ির কর্তার খোঁজে বের হলেন। ভাবছিলেন ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নেবেন। বাইরে গিয়ে যা দেখলেন, তা দেখে তারা হতবাক হয়ে গেলেন। দেখলেন- বাড়ির লোকজন সবাই বারান্দায় রাত কাটিয়েছেন। কনকনে ঠান্ডায় কোনোরকমে ঘুমিয়েছেন তারা। রোমানিয়ান দম্পতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন- ‘আপনারা বাইরে কেন? আপনাদের ঠান্ডা লাগেনি?’ তুরস্কের মানুষটি মুচকি হেসে বললেন- ‘আমাদের বাড়িতে একটাই ঘর। সেই ঘরটা আমরা আপনাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছি। আমরা বারান্দায় রাত কাটিয়েছি, কারণ আপনারা আমাদের মেহমান।’ লোকটি হাসিমুখে কথাটা বললেও রোমানিয়ান দম্পতির চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। তারা ভাবতেই পারেননি- মানুষ নিজের ঘর ছেড়ে মেহমানের জন্য এভাবে ত্যাগ করতে পারে। তারা প্রশ্ন করলেন- ‘এমন শিক্ষা আপনারা কোথায় পেলেন?’ তুরস্কের মানুষটি শান্তভাবে উত্তর দিলেন- ‘আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সা.) আমাদের এভাবেই শিখিয়েছেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন মেহমানকে সম্মান করে।’

এই ঘটনা ড. স্টিফেনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। নবী মুহাম্মাদ (সা.) সম্পর্কে জানতে চান। তুরস্ক থেকেই তারা ইসলাম ও রাসুল (সা.) সম্পর্কে বই সংগ্রহ করেন। রোমানিয়ায় ফিরে যাওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু ড. স্টিফেন এখানেই থেমে যাননি। ইসলামের সৌন্দর্যে তিনি এতটাই মুগ্ধ হন যে এই সৌন্দর্য সবার কাছে পৌঁছে দিতে শুরু করেন। তিনি ভাবতেন- ‘এ কেমন ধর্ম, যে ধর্ম শিক্ষা দেয়- নিজে কষ্ট করে অন্যকে স্বস্তি দিতে।’ তিনি ইসলাম নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করেন এবং দাওয়াতের কাজে নেমে পড়েন। যে ড. স্টিফেন অমুসলিম অবস্থায় তুরস্কে গিয়েছিলেন, তিনি পরবর্তীতে বিশ্বের ১১২টি দেশ ভ্রমণ করেন ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার জন্য। তার মাধ্যমে হাজারেরও বেশি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। মাত্র একজন মানুষের আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েই এই পথচলার শুরু। মেহমানদারি যে ইসলামে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝাতে রাসুল (সা.)-এর জীবনের আরেকটি ঘটনা রয়েছে। একদিন এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর দরবারে এসে বলল- ‘আমি খুব ক্ষুধার্ত।’ নবীজি (সা.) তার কোনো এক স্ত্রীর কাছে খাবারের জন্য পাঠালেন। তিনি বললেন- ‘যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, তার কসম, আমার কাছে পানি ছাড়া কিছুই নেই।’ এরপর একে একে নবীজি (সা.) তার সব স্ত্রীর কাছেই পাঠালেন, সবার উত্তর একই। তখন রাসুল (সা.) সাহবিদের দিকে তাকিয়ে বললেন- ‘আজ রাতে কে এই ব্যক্তির মেহমানদারি করবে? আল্লাহ তার প্রতি দয়া করবেন।’ একজন আনসারি সাহাবি দাঁড়িয়ে বললেন- ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমি করব।’ তিনি মেহমানকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বাড়িতে গিয়ে স্ত্রীকে বললেন- ‘তিনি আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর মেহমান। তার আপ্যায়নের ব্যবস্থা করও।’ স্ত্রী বললেন- ‘বাচ্চাদের জন্য রাখা সামান্য খাবার ছাড়া আমাদের কাছে কিছুই নেই।’ সাহাবি বললেন- ‘ঠিক আছে, সেটুকুই প্রস্তুত করও। বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দিও। মেহমান এলে বাতি নিভিয়ে দেবে, আর আমরা খাওয়ার ভান করব।’ ঠিক সেইভাবেই সব করা হলো। মেহমান খেতে লাগলেন। আর ঘরের সবাই ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত কাটালেন।

পরদিন সকালে নবীজি (সা.) সেই সাহাবিকে দেখে বললেন- ‘গতরাতে তোমাদের কাজে আল্লাহ খুবই সন্তুষ্ট হয়েছেন।’ এ ঘটনার প্রেক্ষিতে পবিত্র কোরআনের সুরা হাশরের একটি আয়াত নাজিল হয়- ‘নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও তারা অন্যকে নিজেদের ওপর অগ্রাধিকার দেয়। নিজ মনের কার্পণ্য থেকে যারা মুক্ত, তারাই সফল।’ এই সাহাবির নাম ছিল আবু তালহা (রা.)। একজন মানুষের আতিথেয়তায় আল্লাহ এতটাই সন্তুষ্ট হন যে কোরআনে আয়াত নাজিল করেন। ইসলামের এই সৌন্দর্যগুলো যদি আমরা নিজের জীবনে ধারণ করতে পারি, তাহলে তা দেখেই ড. স্টিফেনের মতো অনেক মানুষ সত্যের পথে ফিরে আসবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত