
আল্লাহতায়ালা মোমিনদের নেক আমলের প্রতিদানস্বরূপ শান্তি ও স্বস্তির এক চিরন্তন নিবাস তৈরি করে রেখেছেন, যার নাম জান্নাত। কেয়ামতের দিন হিসাব-নিকাশ শেষে মুমিনদের সেখানে প্রবেশ করানো হবে। ‘জান্নাত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘বাগান’। মানুষ সাধারণত বাগানে অনাবিল শান্তি ও হৃদয়ের প্রশান্তি খুঁজে পায়; সম্ভবত সেই কারণেই আখেরাতের আরামদায়ক জীবনকে বাগানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সেখানে মোমিনরা এমন পরম আনন্দ লাভ করবেন যেখানে দুঃখ-বেদনার কোনো চিহ্ন থাকবে না। জান্নাতে মুমিনদের জন্য যেসব নেয়ামত রাখা হয়েছে, তা আজ পর্যন্ত কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের হৃদয়ে তার কল্পনাও কখনো উদিত হয়নি। (বোখারি : ৪৭৭৯)।
জান্নাতের প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের সমান। এর দৈর্ঘ্য ও বিশালতা এতটাই যে, এর ভেতর একশটি স্তর রয়েছে। প্রতিটি স্তর এতই বিস্তৃত যে, যদি সারা বিশ্বের সব মানুষকে শুধু একটি স্তরেই সমবেত করা হয়, তবু সেখানে জায়গা অবশিষ্ট থেকে যাবে। (তিরমিজি : ২৫৩১)।
জান্নাতবাসীরা যা কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করবে তৎক্ষণাৎ তা তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে যাবে। যেমন কোনো পাখি দেখে যদি তার গোশত খাওয়ার ইচ্ছা জাগে, মুহূর্তের মধ্যেই তার সামনে সেই পাখির সুস্বাদু ভুনা করা গোশত হাজির হবে। (সুরা ওয়াকিয়াহ : ২১)। জান্নাতবাসীদের প্রতিটি ইচ্ছা যে পূরণ করা হবে এবং তাদের ওপর মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ বর্ষিত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ প্রসঙ্গে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) একটি চমৎকার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। একবার নবীজি (সা.)-এর কাছে একজন গ্রাম্য লোক বসা ছিল। তখন আল্লাহর নবীজি (সা.) বলছিলেন যে, জান্নাতবাসীদের মধ্যে কোনো এক ব্যক্তি তার রবের কাছে চাষাবাদ বা কৃষিকাজ করার অনুমতি প্রার্থনা করবে।
আল্লাহতায়ালা বলবেন, ‘তুমি এখন যে অবস্থায় আছ তা কি তোমার জন্য যথেষ্ট নয়? তুমি যা চাও তা তো মুহূর্তেই পেয়ে যাচ্ছ, তবে কি এটি তোমার জন্য যথেষ্ট নয়?’ সে বিনীতভাবে উত্তর দেবে, ‘হ্যাঁ, আমার মাবুদ!? কিন্তু আমি আসলে কৃষিকাজ করতে ভালোবাসি।’ অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুমতি পাওয়ার পর সে জমিনে বীজ বপন করবে এবং চোখের পলকেই অঙ্কুরোদগম হয়ে শস্য শ্যামল হয়ে উঠবে। মুহূর্তের মধ্যেই ফসল পেকে যাবে এবং তা কর্তনও হয়ে যাবে। এমনকি সেই ফসলের স্তূপ পাহাড়ের মতো বিশাল আকার ধারণ করবে। তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ‘হে আদম সন্তান! এই নাও, তোমার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে। আসলে কোনো কিছুই তোমার লালসার উদর পূর্ণ করতে পারে না।’ নবীজি (সা.)-এর এই কথা শুনে পাশে বসা সেই গ্রাম্য লোকটি বলে উঠল, ‘আল্লাহর কসম! সেই ব্যক্তি নিশ্চয়ই কুরাইশ অথবা আনসার বংশীয় কেউ হবে। কারণ তারাই মূলত কৃষিজীবী। আমরা তো কৃষক নই।’ গ্রাম্য লোকটির এই রসিকতাপূর্ণ কথা শুনে নবীজি (সা.) মৃদু হাসলেন (বোখারি : ২৩৪৮)। এই হাদিসটি থেকে উপলব্ধি করা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা জান্নাতিদের ওপর কতটা সন্তুষ্ট থাকবেন এবং তিনি তাদের ছোট-বড় সব শখ ও বিচিত্র ইচ্ছা কীভাবে পূরণ করবেন।
জান্নাতিরা সেখানে যা খুশি আহার করবেন, কিন্তু সবই হজম হয়ে যাবে। সেখানে কোনো প্রকার অপবিত্রতা, ময়লা-আবর্জনা, মলমূত্র কিংবা শরীরের কোনো ঘাম বা ময়লা থাকবে না। তাদের ঢেকুর থেকে নির্গত সুগন্ধি যা হবে কস্তুরী ও কর্পূরের চেয়েও সুমধুর। জান্নাতে হীরা ও জহরত খচিত সুউচ্চ প্রাসাদ থাকবে। প্রাসাদের ভেতর থেকে বাইরের দৃশ্য এবং বাইরে থেকে ভেতরের সবকিছু স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। এসব প্রাসাদের দেয়াল নির্মিত হয়েছে সোনা ও রুপার ইট দিয়ে, আর ইটের গাঁথুনিতে মসলার পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে সুগন্ধি কস্তুরীর আস্তর। জান্নাতের জমিন জাফরান দিয়ে তৈরি এবং এর পাথরকুচিগুলোর পরিবর্তে ছড়িয়ে আছে মণি-মুক্তা ও ইয়াকুত পাথর। (তিরমিজি : ২৫২৬)।
জান্নাতবাসীরা যখন তাদের চিরস্থায়ী নিবাসে পৌঁছে যাবে, তখন সেখানে বিচিত্র সব নেয়ামতের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও শ্রেষ্ঠ যে নেয়ামতটি লাভ করবে, তা হলো আল্লাহ তায়ালার চিরন্তন সন্তুষ্টি এবং তাঁর মহিমান্বিত সত্তার দর্শন বা দিদার। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতবাসীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবেন তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের সম্বোধন করে বলবেন, তোমরা কি চাও যে আমি তোমাদের আরও কিছু দান করি?’ তারা আরজ করবেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি কি আমাদের চেহারা উজ্জ্বল করে দেননি? আপনি কি আমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাননি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেননি?’ (অর্থাৎ আমরা যা পেয়েছি তাতেই আমরা ধন্য)। নবীজি বলেন, ‘অতঃপর আল্লাহ তায়ালা (নুরের) পর্দা সরিয়ে দেবেন এবং জান্নাতবাসীরা তাদের রবের দর্শন লাভ করবেন। আল্লাহর দিদারের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কোনো বস্তু জান্নাতিদের কাছে মনে হবে না’ (মুসলিম : ১৮১)। নবীজি (সা.) আরও বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবকে পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবে, যেমন করে তোমরা পূর্ণিমার চাঁদ দেখে থাকো। তাঁকে দেখতে তোমাদের কোনো কষ্ট হবে না অর্থাৎ কারও ওপর চাপিয়ে দেখা হবে না, ঠেলাঠেলি হবে না, অস্পষ্ট দেখা যাবে না।’ (বোখারি : ৭৪৩৬)।
কেয়ামত দিবসে শুধু নেককার ও পরহেজগার বান্দারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর জান্নাত মূলত তাদের জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিজ প্রতিপালকের পক্ষ হতে মাগফিরাত ও সেই জান্নাত লাভের জন্য একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হও, যার প্রশস্ততা আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীতুল্য। যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে’ (সুরা আলে ইমরান : ১৩৩)। তাই এই নশ্বর পৃথিবীতে সৎকর্ম করার পাশাপাশি জান্নাত লাভের জন্য আমাদের সদা-সর্বদা মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত।