
যুগের পর যুগ পদ্মা নদীর আগ্রাসনে ভাঙাগড়ার নির্মম সাক্ষী শরীয়তপুরের বিস্তীর্ণ জনপদ। বর্ষা এলেই হারিয়ে যেত পদ্মাপাড়ের মানুষের চোখের ঘুম, দিন কাটত আতঙ্কে। নদীভাঙনে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে হাজারো পরিবার। স্থানীয়দের কাছে একসময় পদ্মাপাড় পরিচিত ছিল ‘অভিশপ্ত জনপদ’ হিসেবে।
তবে দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে চলা এই ভয়াল বাস্তবতায় পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। নড়িয়া, চরাত্রা নওয়াপাড়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলায় স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের ফলে এসব এলাকায় নদীভাঙনের ভয় অনেকটাই দূর হয়েছে। এতে পদ্মাপাড়ের মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরেছে।
অন্যদিকে, জাজিরা উপজেলার প্রায় ১২ কিলোমিটার ভাঙনপ্রবণ এলাকা এতদিন অরক্ষিতই ছিল। ২০২৪ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড এখানে ৮ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করলে গত দুই বছরে স্থানীয়দের মধ্যে আশার আলো জ্বলে ওঠে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, ২০২৭ সালের জুন মাসে চলমান প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে শুধু জাজিরা নয়, শরীয়তপুরের পুরো ভাঙনপ্রবণ প্রায় ৩৬ কিলোমিটার পদ্মাপাড় স্থায়ীভাবে সুরক্ষিত হবে। এতে বিপন্ন পরিবেশ-প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন গতি সঞ্চারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, ২০১৮ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে নড়িয়া উপজেলায় ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার, চরাত্রা নওয়াপাড়ায় ৮ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার এবং ভেদরগঞ্জ উপজেলায় ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব এলাকায় বাঁধের সুফল এরইমধ্যে দৃশ্যমান।
নদীভাঙন রোধের পাশাপাশি মানুষের জীবনে ফিরেছে নিরাপত্তা ও স্বস্তি। জাজিরা উপজেলার ভাঙনপ্রবণ বড়কান্দি ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. সেন্টু মিয়া বলেন, বুঝতে পারার বয়স থেকেই বর্ষায় পদ্মার ভয়ংকর রূপ দেখে আসছি। বর্ষা এলেই পরিবারের সবার চোখে আতঙ্ক ভেসে উঠত এই বুঝি সবকিছু নদীতে চলে যায়। ২০২৪ সালে স্থায়ী বাঁধের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ভাঙন দেখিনি। কাজ শেষ হলে আমরাও নড়িয়া-ভেদরগঞ্জের মতো স্থায়ী নিরাপত্তা পাব এটার জন্যই এখন আমাদের অপেক্ষা। একই উপজেলার পালেরচর ইউনিয়নের প্রবীণ বাসিন্দা আফসার আলী বলেন, গত ৪০-৫০ বছর ধরে শুধু পদ্মার ভাঙা-গড়ার নির্মম খেলাই দেখেছি। এ পর্যন্ত ১৩ বার বাড়ি-ঘর সরাতে হয়েছে। নদীভাঙনের সময় সামান্য কিছু জিনিস ছাড়া আর কিছুই রক্ষা করা যায় না।
জমিজমা হারিয়ে এখন পরের জমিতে ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস করছি। বাঁধের কাজ শেষ হলে অন্তত বর্ষায় বর্ষায় ঘর সরানোর আতঙ্ক থাকবে না। স্থায়ী কাজকর্মে মনোযোগ দিতে পারব। শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান জানান, পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের ইতিহাস পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের। পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০১৮ সাল থেকে নড়িয়া উপজেলায় ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার এবং চরাত্রা নওয়াপাড়ায় ৮ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন করেছে। এছাড়া ভেদরগঞ্জ উপজেলার ৫ দশমিক ৮ কিলোমিটার বাঁধের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে জাজিরা উপজেলায় ৮ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ শুরু করে এরইমধ্যে ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি কাজ ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি জাজিরায় আরও দুই কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাবনা চূড়ান্তকরণের প্রক্রিয়া চলমান। তিনি আরও বলেন, পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে শরীয়তপুরের পদ্মাপাড়ের প্রায় ৩৫ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার জনপদ দীর্ঘদিনের নদীভাঙন থেকে স্থায়ীভাবে মুক্তি পাবে। এর মাধ্যমে এই অঞ্চল শুধু ভাঙনের ঝুঁকি থেকেই রক্ষা পাবে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতি ও উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।