
জীবন চলার পথে যেখানে পদে পদে বাধা, সীমাবদ্ধতা ও অনিশ্চয়তায় থমকে যান অধিকাংশ মানুষ, সেখানে কেউ কেউ সেই সীমাবদ্ধতাকেই শক্তিতে রূপান্তর করে লেখেন নতুন সম্ভাবনার গল্প। ঠিক তেমনই এক অনন্য সংগ্রামী নারীর নাম আছমা। শরীয়তপুর সদর উপজেলার ডোমসার গ্রামের বাসিন্দা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন এই নারী উদ্যোক্তা পাটকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন পরিবেশবান্ধব শিল্প, কর্মসংস্থান এবং নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এক যুগের ব্যবধানে তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, বদলে দিয়েছেন আশপাশের অর্ধশতাধিক নারীর জীবনের গতিপথ। প্লাস্টিকের আগ্রাসনে যখন পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে, তখন পাটজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আছমা তৈরি করেছেন সবুজ সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।
উদ্যোক্তা আছমা বলেন, ছোট পুঁজিতে বড় স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। সীমাবদ্ধতা কখনই আমার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। আত্মবিশ্বাস ও পরিশ্রমকে হাতিয়ার করে গড়ে তুলেছি নিজস্ব কারখানা। সময়ের ব্যবধানে সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকার মূলধনসমৃদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠানে। তার কারখানায় বর্তমানে ব্লক-বুটিকের শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিসের পাশাপাশি পাটের তৈরি স্কুলব্যাগ, লেডিস ব্যাগ, পাপোষসহ নানা ধরনের নান্দনিক ও ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরি হচ্ছে। দেশীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক নকশার সমন্বয়ে তৈরি এসব পণ্য এরইমধ্যে স্থানীয় বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। নারীর ক্ষমতায়নই আছমার উদ্যোক্তা জীবনের অন্যতম বড় সফলতা। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ২২ জন নারী উদ্যোক্তা। এদের অনেকেই আগে ছিলেন আর্থিকভাবে অসচ্ছল ও আত্মনির্ভরশীলতার বাইরে।
আজ তারা আয় করছেন, সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলছেন। এখানে শুধু নারীদের দিয়ে পণ্য তৈরি করানোই নয়, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। আছমা জানান, আল্পনা লেডিস কর্ণার অ্যান্ড এমএ জুট প্রডাক্টস এর মাধ্যমে তিনি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণসহ সব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তিনি আরও জানান, তার পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে ওমান ও ইতালিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাটপণ্যের নতুন
পরিচিতি গড়ে তুলতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উদ্যোক্তা জীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন জাতীয় যুব পুরস্কারসহ বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের জয়িতা পুরস্কার। এসব স্বীকৃতি তার সংগ্রামী পথচলাকে দিয়েছে নতুন গতি ও প্রেরণা।
জেলা সদরের আংগারিয়া গ্রামের উদ্যোক্তা সুপ্তি বেগম বলেন, আছমা আপার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আমি এখন নিজেই ব্লক-বুটিকের শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিসসহ শিশুদের খেলনা পণ্য তৈরি করছি। এতে আমার পারিবারিক স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে।
শরীয়তপুর সদরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রুহুল আমীন মুন্সী বলেন, যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা গেলে যেমন পাটজাত পণ্যের প্রসার ঘটবে, তেমনি প্লাস্টিক আগ্রাসন রোধেও তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এতে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।
শহর সমাজসেবা সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অনীক ঘটক চৌধুরী বলেন, প্লাস্টিক ও পলিথিন পণ্যের ব্যবহার বর্জন করে মানুষ যদি পাটজাত পণ্যের ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হয়, তাহলে একদিকে আছমার মতো বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন উদ্যোক্তারা স্বাবলম্বী হবেন, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষায়ও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নারী উদ্যোক্তাদের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণ সহায়তা বাড়ানো গেলে আছমার মতো আরও অনেক উদ্যোগ গড়ে উঠবে।
শরীয়তপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রাসেল নোমান বলেন, পলিথিনের ব্যবহার আজ পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। নদী, খাল ও মাটিসহ সর্বত্র প্লাস্টিকের দখল। এই বাস্তবতায় পাটজাত পণ্য পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আছমার উদ্যোগ সেই বার্তাই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। আমরা এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই।