ঢাকা রোববার, ০১ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বনানীর ছায়া

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বনানীর ছায়া

প্রকৃতির নিয়মে শীতের রুক্ষতা বিদায় নিয়েছে অনেক আগেই। ঋতুরাজ বসন্ত তার পসরা সাজিয়ে বসেছে চারদিকে। তবে এই বসন্তের রূপ এবার শুধু গ্রামের মেঠোপথ কিংবা গহীন অরণ্যে সীমাবদ্ধ নেই; আধুনিকতার প্রতীক পিচঢালা রাজপথও যেন আজ প্রকৃতির ক্যানভাস। দেশের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এখন আর শুধু যান্ত্রিকতার রুট নয়, বরং এক দীর্ঘ পুষ্পশোভিত বাগানে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কুমিল্লার বুক চিরে যাওয়া এই মহাসড়কের অংশটুকু এখন যেন বসন্তের রঙে আঁকা এক নান্দনিক ছবি।

দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রামের সিটি গেট পর্যন্ত ১৪৩ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ। এক সময় যা ছিল শুধু ধুলোবালি আর যান্ত্রিক কোলাহলের সাক্ষী, আজ সেখানে বাতাসের দোলায় মাথা নাড়ায় কৃষ্ণচূড়া, সোনালু আর জারুলের দল। সরকারি উদ্যোগে এই মহাসড়কের বিভাজক বা মিডিয়ানে রোপণ করা হয়েছে প্রায় ১৩ থেকে ২৫ প্রজাতির ৫০ হাজারেরও বেশি চারা। আজ সেই চারাগুলো পূর্ণ যৌবনা বৃক্ষে রূপ নিয়েছে। রাধাচূড়া, কাঞ্চন, বকুল, কদম, পলাশ, টগর, গন্ধরাজ, করবী, হৈমন্তী আর কুরচির সমারোহে মহাসড়কটি এখন যেন এক দীর্ঘায়িত উদ্যান।

কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার নাজিরা বাজার থেকে শুরু করে চান্দিনার কাঠেরপুল পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যে দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে, তা কোনো ভ্রমণপিপাসুর চোখ এড়ানোর সাধ্য নেই। নাজিরা বাজার থেকে বুড়িচংয়ের কোরপাই পর্যন্ত নীলচে-বেগুনি জারুলের মায়া, আর কোরপাই থেকে কাঠেরপুল পর্যন্ত লাল সোনাইলের উদ্ধত সৌন্দর্য পথচারীদের বিমোহিত করে রাখছে। চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে হয়, কোনো দক্ষ শিল্পী বুঝি রাস্তার মাঝখানে রঙের আলপনা এঁকে দিয়েছেন। পিচঢালা কালো পথের সমান্তরালে এই রঙের মেলা নাগরিক জীবনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় মুহূর্তেই। এই সৌন্দর্যের পেছনে শুধু নান্দনিকতা নয়, কাজ করছে গভীর এক প্রকৌশলগত দর্শনও। সড়ক ও জনপথ বিভাগের নিপুণ পরিকল্পনায় এই গাছগুলো লাগানো হয়েছিল দুটি প্রধান উদ্দেশে।

প্রথমত, মহাসড়কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে যাত্রীদের মানসিক প্রশান্তি দেওয়া।

দ্বিতীয়ত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো, রাতের বেলায় বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনের তীব্র হেডলাইটের আলো যেন চালকের চোখে সরাসরি না পড়ে। এই সবুজ দেয়াল বা ‘লিভিং বেরিয়ার’ একদিকে যেমন দুর্ঘটনা রোধে ঢাল হিসেবে কাজ করছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে পরম মমতায়। মহাসড়কের নিয়মিত যাত্রী এবং কুমিল্লার চান্দিনার বাসিন্দা ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা আবুল কাশেমের কণ্ঠে ঝরল মুগ্ধতার প্রতিধ্বনি। তিনি বলছিলেন, ফোরলেন হওয়ার পর এই মহাসড়কটি যখন বাহারি ফুলে সেজেছে, তখন এর রূপ বদলে গেছে আমূল।

ভিনদেশি পর্যটকরা যখন এই পথ দিয়ে যাতায়াত করেন, তারা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন। অনেকে গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলেন, ভিডিও করেন। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের এই সুশোভিত রূপ যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন গর্বে বুক ভরে ওঠে। এটি শুধু একটি রাস্তা নয়, বরং বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের এক নতুন পরিচিতি। সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মীরাও নিরলসভাবে এই বৃক্ষরাজির পরিচর্যা করে যাচ্ছেন। রোদণ্ডবৃষ্টি মাথায় নিয়ে তারা নিশ্চিত করছেন যেন প্রতিটি গাছ তার আপন মহিমায় টিকে থাকে। যদিও কিছু স্থানে বৈরী আবহাওয়ায় কিছু গাছ মরে গেছে, তবে সামনের বর্ষায় সেখানে নতুন চারা রোপণের পরিকল্পনা প্রকৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

বসন্তের এই তপ্ত দুপুরে যখন তপ্ত পিচ থেকে তাপ বেরোয়, তখন এই সারি সারি গাছ আর থোকা থোকা ফুল যেন শীতল পরশ বুলিয়ে দেয়। মহাসড়কের ধারের জনপদ আর হাজার হাজার যাত্রীর কাছে এই পথ এখন এক দীর্ঘ কবিতার মতো।

যান্ত্রিক সভ্যতার ভিড়ে এক চিলতে অরণ্যের স্বাদ নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আজ আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে উন্নয়ন আর প্রকৃতি যখন হাত ধরাধরি করে চলে, তখন সাধারণ এক যাত্রাপথও হয়ে উঠতে পারে স্বর্গীয় অনুভূতির আধার।

বসন্তের এই রঙ যেন চিরস্থায়ী হয় এই রাজপথে, এমনটাই প্রত্যাশা প্রতিটি ঘরমুখো মানুষের।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত