
ছোট ফেনী নদী এখন তীরবর্তী কৃষকদের দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সাগরের নোনা পানি নদীতে ঢুকে পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন। স্থানীয় কৃষকরা জানান, ছোট ফেনী নদীর পানি সেচ দিয়ে চরাঞ্চলের চাষিরা বিভিন্ন মৌসুমে সবজি ও ধান চাষ করেন। এ জন্য প্রধানত এ নদীর ওপর নির্ভরশীল তারা। শুকনো মৌসুম শুরু হতে না হতেই নদীতে লবণের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। বিগত বন্যায় নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় নির্মিত মুসাপুর ক্লোজার ভেঙে যায়। এতে সাগরের লবণাক্ত পানি অবাধে প্রবেশ করছে নদীতে। আগে যেখানে বোরো ধান ও শীতকালীন সবজিতে নদী থেকে সেচ দেওয়া হতো, এখন সেই পানি জমিতে দিলেই চারা পুড়ে লাল হয়ে যাচ্ছে।
গভীর নলকূপ দিয়ে আর নদীর পানি কৃষি জমিতে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এ কারণে কৃষি উৎপাদনে কৃষকরা হতাশ। কৃষকরা আরও জানান, পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে যাচ্ছে এই অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি।
তাছাড়া বঙ্গোপসাগরের সাগরের নোনা পানির সঙ্গে নদীতে প্রচুর বালু প্রবেশ করে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে নাব্যতা সংকটে পড়েছে নদীটি। শুধু ধান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রবি শস্যও। উপকূলীয় এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে তরমুজ, শসা, মিষ্টা কুমড়া ও মরিচ চাষ হয়। লবণাক্ত পানির কারণে এসব ফসলের জমি এখন অনেকটা অনাবাদি পড়ে আছে।
সোনাগাজী উপজেলার চরআদর্শ গ্রামের মোহাম্মদ আবদুল হালিম বলেন, ‘আগে এই নদীর পানি দিয়া আমরা আমন আর বোরো-দুইটাই করতাম। এখন নদীর পানি মুখে দিলে জিহ্বা জ্বলে। এই পানি দিয়া চারা ভিজাইলে দুই দিন পর ধান গাছ মারা যায়। আমাগো বাঁচার পথ বন্ধ হইয়া যাচ্ছে।’ ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নের হকদি গ্রামের কৃষক নুরুল আমিন বলেন, আগে আমরা বিএডিসির সেচ পাম্প দিয়ে নদী থেকে পানি তুলে জমিতে সেচ দিতাম। এতে কম খরচে পানি ব্যবহার করে আমরা ফসল উৎপাদন করতাম। এখন নদীতে নোনা ও বালিযুক্ত পানি ঢুকে পড়ায় সেই পানি আর ব্যবহার করতে পারছি না। এতে আমাদের অনেক কৃষক এবার জমিতে নামেন নাই। এ অবস্থার সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আমরা সংকটে পড়ে যাব।
অন্য কৃষক নুরুল আলম ভূঁইয়া জসিম জানান, ছোট ফেনী নদীর ওপর ভিত্তি করে নোয়াখালী ও ফেনীর কয়েক লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা চলে। লবণাক্ততার কারণে সেচের পানির অভাবে শতশত একর জমি অনাবাদি পড়ে আছে। বিকল্প হিসেবে গভীর নলকূপ বসাতে গিয়ে চাষিদের উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। নোনা পানির প্রভাবে ঘাস ও লতাগুল্ম মারা যাওয়ায় গবাদি পশুর খাবারের তীব্র অভাব দেখা দিচ্ছে। তাই সরকারের কাছে জোর দাবি, অবিলম্বে মুসাপুর ক্লোজারটি নির্মাণ করে আমাদের কৃষকদের বাঁচতে দিন।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এই সংকট নিরসনে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যার মধ্যে রয়েছে মুসাপুর ক্লোজার দ্রুত নির্মাণ করা; স্লুইস গেটগুলোর আধুনিকায়ন ও সঠিক সময়ে গেট বন্ধ ও খোলার ব্যবস্থা করা; ছোট ফেনী নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং করা, যাতে মিষ্টি পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে; কৃষকদের মধ্যে লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধান ও ফসলের বীজ সরবরাহ করা এবং সরকারি উদ্যোগে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য পুকুর ও খাল পুনঃখনন করা।
এ ব্যাপারে দাগনভুঞা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামরুজ্জামান বলেন, ছোট ফেনী নদীতে ফেব্রুয়ারি থেকে অতিমাত্রায় লবণাক্ত পানি প্রবাহের কারণে নদী অববাহিকায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে আমরা এ বিষয়ে কৃষকদের বিকল্প পানির উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। অনেক কৃষক জীবন-জীবিকার তাগিদে বিকল্প উৎসের পানি দিয়ে চাষাবাদ করছেন বলে জানতে পেরেছি।
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, মূলত নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের মুসাপুর ক্লোজার না থাকার কারণেই ছোট ফেনী নদীতে সাগরের নোনা পানি প্রবেশ করছে। মুসাপুর ক্লোজার নির্মিত হলে চরাঞ্চলের সমস্যাগুলো সহজেই সমাধান করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, আমার জানা মতে মুসাপুর ক্লোজার প্রকল্পটি এখন প্ল্যানিং কমিশনে রয়েছে। এটি পাস হয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলে নদীভাঙন সমস্যা এবং জোয়ারভাটার কারণে পানি সমস্যা এবং লবণাক্ত পানিপ্রবাহ দূর হয়ে কৃষকদের উপকারে আসবে। উপকূলীয় এই অঞ্চলের কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য এখন ছোট ফেনী নদীর পানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। যদি এখনি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এই অঞ্চলটি ভবিষ্যতে মরুভূমি বা স্থায়ীভাবে পতিত জমিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। যাতে কৃষি ও কৃষক মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।