
মানব সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে মৃৎশিল্প। ইতিহাসের প্রাচীনতম প্রত্ননিদর্শনগুলোর মধ্যেও মাটির তৈরি পাত্র, কলস ও তৈজসপত্রের উপস্থিতি মানব সভ্যতার বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। মাটির এই শিল্প শুধু মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনই পূরণ করেনি, বরং যুগ যুগ ধরে মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েই টিকে ছিল।
কিন্তু আধুনিকতার করাল গ্রাসে আজ সেই পরিবেশবান্ধব ও ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। এক সময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরের রান্নাঘরে দেখা যেত মাটির হাঁড়ি-পাতিল, কলস, থালা কিংবা নানান ধরনের বাসনকোসন। মাটির কলসে রাখা ঠান্ডা পানি, মাটির হাঁড়িতে রান্না করা ভাত কিংবা দই জমার হাঁড়ি এসবই ছিল গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা দৃশ্য। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই ধূসর স্মৃতি।
পরিবেশবিদদের মতে, উনবিংশ শতাব্দীর পর থেকেই মৃৎশিল্পের আধুনিকায়ন ধীর হয়ে পড়ে। পরে ১৯৫০-এর দশক থেকে প্লাস্টিক ও মেলামাইন পণ্যের ব্যাপক বিস্তারের ফলে মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার দ্রুত কমতে শুরু করে। সহজলভ্যতা, তুলনামূলক টেকসই ব্যবহার এবং বাজারজাতকরণের সুবিধার কারণে মানুষ ধীরে ধীরে প্লাস্টিক ও ধাতব পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে শতাব্দীপ্রাচীন এই শিল্পের জন্য।
এক সময় গ্রামবাংলার প্রতিটি রান্নাঘরে চুলার আগুনে ফুটত মাটির হাঁড়িতে রান্না করা ভাত ও তরকারি। দুধ দোহন, পানি সংরক্ষণ, দই তৈরি- নিত্যদিনের প্রায় প্রতিটি কাজেই ছিল মাটির পাত্রের ব্যবহার। শুধু ব্যবহারিক দিক থেকেই নয়, মাটির তৈরি নানা সামগ্রী গ্রামীণ সংস্কৃতি ও নান্দনিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিশেষ স্থান দখল করে ছিল। নকশাদার টালি, শৌখিন পাত্র কিংবা সাজসজ্জার সামগ্রী গ্রামীণ ঐতিহ্যের সৌন্দর্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক, মেলামাইন ও ধাতব পণ্যের আগ্রাসনে আজ সেই ঐতিহ্য যেন ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। শুধু একটি শিল্পই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য দক্ষ কারিগরের জীবন-জীবিকাও আজ হুমকির মুখে। নতুন প্রজন্মও ক্রমশ এই পেশা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কারণ এই শিল্পে আগের মতো আর্থিক স্বচ্ছলতা বা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই।
শরীয়তপুর জেলার ডামুড্যা উপজেলার সিড্যা পালপাড়া গ্রামের প্রবীণ মৃৎশিল্পী গিরিধারী পাল স্মৃতিকাতর কণ্ঠে বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এই অঞ্চল মৃৎশিল্পের জন্য সুপরিচিত ছিল। রান্না করা, পানি রাখা, দই জমানোসহ প্রায় প্রতিটি কাজেই ব্যবহার হতো মাটির তৈরি হাঁড়ি, কলস ও বাসন। শুধু তাই নয়, সুন্দর নকশার টালিও তৈরি হতো এখানে, যা এলাকার ধনাঢ্য পরিবারের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
তিনি আরও বলেন, আমাদের বাড়ির পাশের খালটিতে এক সময় সারি সারি নৌকা বাঁধা থাকত। সেসব নৌকায় করে দূর-দূরান্তে পাঠানো হতো মাটির তৈরি নানা সামগ্রী। তখন এই এলাকায় শতাধিক পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। কিন্তু প্লাস্টিক ও মেলামাইনের দাপটে আজ সেখানে রুগ্নভাবে টিকে আছে মাত্র পাঁচ থেকে সাতটি পরিবার। এই শিল্প এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
তবে গিরিধারী পাল মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আবারও নতুন করে জেগে উঠতে পারে এই শিল্প।তার ভাষায়, ঢাকাই মসলিন যেমন একসময় বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিল, তেমনি মাটির তৈরি শৌখিন ও নান্দনিক সামগ্রীও আন্তর্জাতিক বাজারে স্থান করে নিতে পারে। এতে শুধু এই শিল্পই টিকে থাকবে না, মৃৎশিল্পীদের জীবনেও ফিরবে নতুন সম্ভাবনা।
মাটির পণ্যের উপর গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর শরীয়তপুরের সহকারী পরিচালক মো. রাসেল নোমান বলেন, মাটির পণ্য সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেলে তা সহজেই মাটির সঙ্গে মিশে যায় এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে। কিন্তু প্লাস্টিক বা মেলামাইন দীর্ঘদিন মাটির সঙ্গে মিলে থেকেও স্বাভাবিক গঠন ও উর্বরতা নষ্ট করে দেয়। তাই পরিবেশ রক্ষায় মাটির পণ্যের ব্যবহার যেমন পরিবেশের জন্য উপযোগী তেমনি মৃৎশিল্পের পুনর্জাগরণের জন্যও জরুরি।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের মেডিসিন ও কার্ডিওলজিস্ট ডা. কনক জ্যোতি মন্ডল বলেন, মাটির পাত্রে রান্না করা ও পরিবেশন করা খাবার তুলনামূলকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত। অন্যদিকে নিম্নমানের প্লাস্টিক বা অনিরাপদ পাত্র ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই মাটির তৈজসপত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে পুনর্জীবিত করবে না, একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণ কমানো এবং মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরিবেশবিদদের মতে, এই প্রাচীন শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সময়োপযোগী উদ্যোগ। সরকারি সহায়তা, আধুনিক প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ সুবিধা এবং বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে মৃৎশিল্পকে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। পাশাপাশি পরিবেশ সচেতনতা বাড়িয়ে মানুষকে আবারও মাটির পণ্যের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। ঐতিহ্য, পরিবেশ এবং মানুষের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা হাজার বছরের এই শিল্পকে রক্ষায় এখন প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। যথাযথ পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতাই পারে পরিবেশবান্ধব এই মৃৎশিল্পের প্রাণ ফিরিয়ে দিতে।