ঢাকা মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

গ্রাহকের ৪ কোটি টাকা নিয়ে এনজিওর লোকজন উধাও

গ্রাহকের ৪ কোটি টাকা নিয়ে এনজিওর লোকজন উধাও

নওগাঁয় একটি বেসরকারি সংস্থা ‘উদয়ের পথে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ কার্যক্রম বন্ধ করে গ্রাহকের প্রায় ৪ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির অফিস হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আমানতকারীরা।

ঘটনার পর থেকে সংস্থার পরিচালক আসাদুজ্জামান টিটু ও সহকারী ম্যানেজার মাসুদ রানা বিদ্যুৎ গা ঢাকা দিয়েছেন। প্রতিদিন গ্রাহকরা ওই সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে কাউকে না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা সহ তাদের ঘাম ঝরানো কষ্টার্জিত টাকা ফেরতের দাবি জানিয়েছেন।

নওগাঁ সদর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের ধামকুড়ি গ্রামে অবস্থিত ‘উদয়ের পথে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ সংস্থার প্রধান কার্যালয়। যা সমবায় থেকে নিবন্ধিত বেসরকারি সংস্থা। প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে সংস্থার পরিচালক আসাদুজ্জামান টিটু ও সহকারি ম্যানেজার মাসুদ রানা বিদ্যুৎ সহ ১০ জন তারা সঞ্চয়, ডিপিএস ও আমানতের টাকা সংগ্রহ করে আসছিল।

তারা গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের প্রলোভন দিয়ে প্রতি লাখে দুই হাজার টাকা মুনাফা দিয়ে আমানত রাখতে উদ্বৃদ্ধ করতো। না বুঝে অনেকে লোভে পড়ে তাদের জীবনের সব সঞ্চয় রেখেছিল। কেউ মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য, কেউ তাদের সন্তানদের পড়াশুনার জন্য, আবার কেউ বাড়ি তৈরি করার জন্য লাখ লাখ টাকা আমানত রেখেছিল। তাদের ফাঁদে পা দিয়ে লাখ লাখ টাকা আমানত রেখে এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে।

ঈদুল-আজহার দীর্ঘ ছুটির মধ্যে সংস্থার কার্যক্রম বন্ধ করে গা ঢাকা দিয়েছে এর সাথে জড়িত কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা। এ সংস্থাটি তিন শতাধিক গ্রহকের প্রায় ৪ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয়, ডিপিএস ও আমানতের টাকা সংগ্রহ করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি অফিস বন্ধ করে সংশ্লিষ্টরা আত্মগোপনে চলে গেলে গ্রাহকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

ফুটপাতের ফল ব্যবসায়ি ধামকুড়ি গ্রামের বয়জেষ্ঠ্য আব্দুর রহমান বলেন- অসুস্থ প্রতিবন্ধী স্ত্রীকে নিয়ে টিনের ঘরে বসবাস করছি। আমিও অসুস্থ।

বর্তমানে কোন কর্ম করতে পারি না। বাড়ির পাশে ‘উদয়ের পথে’ সংস্থ। বিশ্বাস করে কর্মজীবনের সব সঞ্চয় ৩ লাখ টাকা গত ৫ বছর আগে সেখানে রেখেছিলেন। স্বপ্ন ছিলো ওই টাকা দিয়ে বাড়ি তৈরি করবো। তারা বলেছিল লাভের টাকা দিয়ে বাড়ি করা যাবে। শুরুতে লাখে ২ হাজার টাকা লভ্যাংশ দিলেও কয়েক মাস পর থেকে শুরু হয় নানা টালবাহানা। ঈদের মধ্যে সংগঠনটি রাতারাতি পালিয়ে যাওয়ায় এখন এ পরিবারটি পথে বসার উপক্রম। অর্থের অভাবে স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে পারছি না।

একই গ্রামের গার্মেন্টস কর্মী সীমা বলেন- সংস্থার পরিচালক আসাদুজ্জামান টিটু আমার শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষককে বিশ্বাস করে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ২ লাখ টাকা সেখানে রেখেছিলাম। ভবিষ্যতে মেয়ের বিয়ে দিতে হবে।

টাকা-পয়সা লাগবে কোথায় পাবো এই ভেবে রাখা হয়েছিল। কিন্তু এভাবে প্রতারিত হবো জানতাম না। এখন পথে বসার উপক্রম। আমার ঘাম ঝরানো কষ্টার্জিত টাকা ফেরতের দাবি জানায়।

গৃহবধু মারুফা বিবি বলেন- গরীব মানুষ। ৭ বছর আগে ৭০ হাজার টাকা ওই সংস্থায় রেখেছিলাম। ব্রেস্ট ক্যান্সারে অসুস্থ হাওয়ার পর এক বছর আগে কিছু টাকা উঠাতে গিয়েছিলাম। টাকা তো দেয়নি তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে বিদায় করে দেয়। পরে স্বামীর হাতে তারা ২০ হাজার টাকা দেয়। কিন্তু বাঁকী টাকা তারা না দিয়ে পালিয়ে গেছে।

একই গ্রামের আশরাফুল ইসলাম বলেন- শুরুতে সংগঠনের কার্যক্রম ভালই চলছিল। করোনা মহামারির পর থেকে সংস্থার কার্যক্রমের পরিসর ছোট হতে থাকে। মাঠ থেকে টাকা সংগ্রহ করা হলেও গ্রাহকদের কোন ঋন দেওয়া হতো না।

এমনকি লাভের টাকাও দেওয়া হতো না। সংস্থার পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে গ্রামে গ্রাহকের সাথে বৈঠক হয়েছিল। সেখানে আলোচনা হয়েছিল তারা এক বছর কোন লাভ দিতে পারবে না।

পর্যায়ক্রমে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিবে। গ্রাহকরাও এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিল। কিন্তু এখন তারা সংস্থার কার্যক্রম বন্ধ করে গ্রাহকদের টাকা নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে।

রোববার ধামকুড়ি গ্রামে গিয়ে সংস্থায় তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া সংস্থার পরিচালক আসাদুজ্জামান টিটু ও সহকারি ম্যানেজার মাসুদ রানা বিদ্যুৎ এর বাড়িতে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি।

নওগাঁ সদর উপজেলা সমবায় অফিসার মোঃ জাহাংগীর আলম বলেন- এ উপজেলার যোগদানের পর ওই সংস্থায় চলতি বছর একটি অডিট(পরিদর্শন) পেয়েছি। সেসময় তারা কোন কাগজপত্র দাখিল করেনি।

ওই সংস্থাটি বাতিল করতে গত ১৫ দিন আগে একটি নোটিশ করা হয়েছে। তবে সংস্থাটি পালিয়ে গেছে কিনা আমার জানা নেই। এছাড়া এ বিষয়ে কেউ কোনও অভিযোগ করেনি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত