
রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী শিল্পনগরী গাজীপুর শহরের যানজট নিরসন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নাগরিক বিনোদনের সুযোগ বাড়াতে নেওয়া হয়েছে এক মহাপরিকল্পনা। শহরের প্রাণকেন্দ্র রাজবাড়ী রোড মহিলা কলেজ থেকে শিববাড়ী মোড় পর্যন্ত সড়কটি ৬০ ফুটে উন্নীতকরণ, গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে ওভারপাস নির্মাণ এবং ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজদীঘিকে কেন্দ্র করে নান্দনিক সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পের মাধ্যমে বদলে যাচ্ছে পুরো নগরীর রূপরেখা। সমন্বিত এ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে গাজীপুর যেমন পাবে যানজটমুক্ত সুশৃঙ্খল এক পরিবহন ব্যবস্থা, তেমনই রক্ষা পাবে শহরের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য।
গত বুধবার এসব প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থান ও সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন করেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের (গাসিক) প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকার এবং জেলা প্রশাসক মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া। এসময় সিটি কর্পোরেশন ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সড়কের উভয় পাশের সীমানা এবং পরিমাপের বিষয়টি খতিয়ে দেখেন।
পরিদর্শন শেষে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মো. শওকত হোসেন বলেন, শিল্প ও ঘনবসতিপূর্ণ গাজীপুর শহরের জন্য রাজবাড়ী রোড থেকে শিববাড়ী মোড় পর্যন্ত দীর্ঘদিনের সংকীর্ণ সড়কটি এক বড় নাগরিক ভোগান্তির কারণ ছিল। এ রাস্তাটি ৬০ ফুট প্রশস্ত করা হলে শহরের ভেতরে পরিবহন চলাচল স্বাভাবিক হবে এবং দীর্ঘদিনের স্থবিরতা দূর হবে।
সড়ক কাঠামোর নতুন নকশা সম্পর্কে প্রশাসক বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়ে কলের বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কটি ৬০ ফুটে উন্নীত হয়ে ভাওয়াল রাজদীঘির সঙ্গে সংযুক্ত হবে। অন্যদিকে, পূবাইল নিলের পাড়া হয়ে এ রাস্তাটি মহিলা কলেজের সঙ্গে রাজবাড়ী সড়কে মিলবে এবং হানগাটা দিয়ে মূল সিলেট রুটের সঙ্গে যুক্ত হবে। পাশাপাশি গাজীপুর জজ কোর্ট এলাকার রাস্তাটি ৪০ ফুট প্রশস্ত করে শ্মশানঘাট এলাকায় নিয়ে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ রুটগুলো সচল হলে মূল শহরের ওপর যানবাহনের বাড়তি চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
প্রশাসক আরও জানান, যানজট নিরসনে সড়ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি রেলক্রসিংগুলোতে ওভারপাস নির্মাণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে গতিশীল করতে রেল কোচিংয়ের ওপর একটি দৃষ্টিনন্দন ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে। আগামী ১৭ আগস্ট (সোমবার) এ প্রকল্পের দরপত্র (টেন্ডার) লাইভে যাবে।
তিনি বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি গাজীপুরের ঐতিহ্য সুরক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজদীঘিকে ঘিরে। শতাব্দী প্রাচীন এ দীঘির নান্দনিক রূপ ফিরিয়ে এনে তা নগরবাসীর প্রধান বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে শিশুদের জন্য পার্ক, হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে) ও নানা দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা তৈরি করা হবে।
প্রশাসক মো. শওকত হোসেন সরকার বলেন, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীরা বর্তমানে এ প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা তৈরির কাজ করছেন, যা খুব দ্রুতই বাস্তবায়নের মুখে দেখবে।
সমন্বিত এ পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নুরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, গাজীপুরকে একটি বাসযোগ্য ও পরিকল্পিত নগরীতে রূপান্তর করতে অবকাঠামোগত কাঠামোর সঙ্গে ঐতিহ্যের সংমিশ্রণ প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের মধ্যে আন্তঃসমন্বয় নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ, সীমানা নির্ধারণ ও কারিগরি দিকগুলো দ্রুত নিস্পত্তি করা হচ্ছে, যাতে দ্রুত কাজ শুরু করা যায়।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ তানজিলা খানম বলেন, নগরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে কাজের গুণগত মান এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
প্রকল্পের স্থান পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন, সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুদীপ বসাক, সচিব ফিরোজ আল মামুনসহ জেলা প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
দীর্ঘদিনের নগর ভোগান্তি কাটিয়ে একটি সমন্বিত, পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক গাজীপুর গড়ে তুলতে এসব উন্নয়ন প্রকল্প নগরবাসীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আগামী দিনগুলোতে প্রকল্পগুলোর দৃশ্যমান বাস্তবায়ন গাজীপুরকে একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক শিল্পনগরে উন্নীত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নগরবাসী।