
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে ৬০১ কোটি ৭৯ লাখ ৭ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু গত সোমবার বেলা ১১টায় নগর ভবনের শহীদ আলতাফ মিলনায়তনে জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তিনি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের ৩৩৮ কোটি ৯৭ লাখ ২১ হাজার টাকার সংশোধিত বাজেটও পেশ করেন। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ২১১ কোটি ৯০ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪১ কোটি ৪৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা। এছাড়া সরকারি বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৯৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা। ৮০০ কোটি টাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পটি শেষ হওয়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ কম হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
কেসিসি'র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বাজেট কাম একাউন্টস অফিসার মো. মনিরুজ্জামান। প্রধান অতিথির বক্তৃতায় কেসিসি প্রশাসক মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক সফল প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া-কে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ একং কেসিসি'র প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেন, মার্চ মাসে কেসিসি'র প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে খুলনা মহানগরীকে একটি পরিচ্ছন্ন সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সিটি কর্পোরেশনের বাজেট ঘোষণার মধ্যদিয়ে একটি নগরীর উন্নয়ন ভাবনা প্রতিফলিত হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটও সেই উন্নয়ন ভাবনাই প্রতিফলিত হয়েছে এবং খুলনাকে একটি শান্তি ও স্বস্তির নগরী হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য। নিজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকার ও বিভিন্ন দাতা সংস্থার সহযোগিতা আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানে প্রশাসক মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং জুলাই আন্দোলনে শহিদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং তাদের রূহের মাগফেরাত কামনা করেন। বাজেটের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে গিয়ে প্রশাসক বলেন, এটি একটি উন্নয়নমুখী বাজেট। নতুন কোনো কর আরোপ না করে বকেয়া পৌরকর আদায়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নবনির্মিত স্থাপনার উপর প্রচলিত নিয়মে পৌরকর ধার্য্য, মার্কেট, দোকান, নতুন স্থাপনা নির্মাণ ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে নিজস্ব আয়ের সম্প্রসারণ করাই বাজেটের মূল লক্ষ্য। এছাড়া স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসন, ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া প্রতিরোধে মশক নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও নগরবাসীর স্বাস্থ্য সেবা সম্প্রসারণসহ স্থাপনাগুলো রক্ষণা-বেক্ষণের ওপর এ বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেসিসি'র দাপ্তরিক কার্যক্রমের আধুনিকায়নসহ সড়ক, ড্রেন ও ধর্মীয় উপসনালয়ের উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাজেটের সফল বাস্তবায়নে তিনি সব শ্রেণি-পেশার নাগরিকের পরিপূর্ণ আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।
বাজেট বর্ণনায় কেসিসি প্রশাসক বলেন, মাস্টার রোল ও আউটসোসিং কর্মকর্তা কর্মচারী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের বেতন ভাতা, নিজস্ব সংস্থাপন ব্যয় মিটিয়ে নিজস্ব তহবিল হতে উন্নয়ন খাতে ৭৩ কোটি ৩৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পূর্তখাত, বিএমডিএফ, অবকাঠামো তৈরি, সড়কবাতি, শিক্ষা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, সমাজকল্যাণ, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, ভেটেরিনারি ও কঞ্জারভেন্সি উন্নয়ন খাতে ৫৫ কোটি ২৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা, মেরামত ও রণাবেণ খাতে ১৮ কোটি ৯ ল টাকা এবং মূলধন খাতে ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), থোক ও বিশেষ বরাদ্দে চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা।
থোক বরাদ্দ থেকে পূর্ত খাতে ৯২ কোটি ৮৭ ল টাকা, জরুরি পানি চাহিদা খাতে ২ কোটি টাকা, ভেটেরিনারি খাতে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, জনস্বাস্থ্য খাতে ২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং কঞ্জারভেন্সি খাতে ৩৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় এডিপিতে ৩টি প্রকল্পে ৪৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা চলতি বছরে পাওয়া যাবে। চলমান প্রকল্পের বিবরণ তুলে ধরে কেসিসি প্রশাসক বলেন, খুলনা মহানগরীতে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্পে প্রাক্কলিত ব্যয় ৮২৩ কোটি ৭৯ লাখ ০৬ হাজার টাকার মধ্যে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৯৩ কোটি ৪০ লাখ ৬০ হাজার টাকা যার মধ্যে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতি মোকাবেলায় খুলনা শহরের উন্নয়ন প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ কোটি ১২ লক্ষ টাকা। এছাড়া ২ হাজার ২৫৫ কোটি ১ লাখ ২২ হাজার টাকার খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এছাড়া দাতা সংস্থা বিশ্ব ব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, জার্মান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, বিল এন্ড এএমপি মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, জার্মান উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জিআইজেড উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে সহযোগিতা করছে এবং বর্তমানে বিভিন্ন দাতা সংস্থার মাধ্যমে ৯টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ সব প্রকল্পে ৭৯ কোটি ৪৬ ল ৫৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা শিগগিরই পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। প্রকল্পগুলো হচ্ছে নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প-২, হেলদি সিটি খুলনা আরবান লীড প্রোগ্রাম, কাইমেট চেঞ্জ এডাপটেড আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, সাসটেইন্যাবল আরবান ওয়াটার সাইকেল প্রকল্প, কোভিট-১৯ রেসপন্স এন্ড রিকভারী প্রকল্প, ইউনিসেফ সাপোর্টেড কাইমেট স্মার্ট ওয়াস, লিভেবল এন্ড ইনকুসিভ সিটিস ফর অল, রিজিওনাল আরবান টিউটরিয়াল প্রকল্প এবং এমএসিপি প্রকল্প সাপোর্ট ইউনিসেফ। খুলনা ওয়াসা'র চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, জামায়াতে ইসলামী-খুলনা মহানগর শাখার আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানসহ সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ও নাগরিক নেতারা ও কেসিসি কর্মকর্তারা বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।