
টাঙ্গাইলে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে গরিবের 'রাজপ্রাসাদ' খ্যাত ঐতিহ্যের মাটির ঘর। টাঙ্গাইলের মধুপুর, ঘাটাইল ও সখিপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পাহাড়ি লাল মাটি অধ্যুষিত। আর এ পাহাড়ি অঞ্চলে প্রতিটি পরিবারে মাটির ঘরই ছিল তাদের বসবাসের একমাত্র অবলম্বন। আবর্তে এসব অঞ্চলে অধিকাংশ পরিবারে সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে প্রবাসে রয়েছেন। তাদের উপার্জিত অর্থে অনেক পরিবারেই সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। এছাড়া পাহাড়ি লাল মাটিতে জেলার বেশিরভাগ শাকসবজি চাষ হয়।
শাকসবজি ছাড়াও আনারস, কলা, পেঁপে, কচু, হলুদ ও আদা চাষ করে তারা নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল করে তুলেছেন। এ কারণে তারা সামাজিকভাবে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে প্রাচীন সেই মাটির ঘর ভেঙে ইট সিমেন্টের পাকা বাড়ি তৈরি করছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন তারা বহুতল ভবন বা পাকা দালানের মধ্যেই থাকতে স্বস্তিবোধ করেন।
এ কারণে দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে মাটির ঘর। এক সময় টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর, ধনবাড়ী, ঘাটাইল, সখিপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বেশিরভাগ বাড়িতে ছিল মাটির ঘর। কিন্তু মানুষের রুচিবোধের পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে ঐসব বাড়িতে মাটির ঘরের জায়গায় শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন ডিজাইনের পাকা দালান। বর্তমানে ঐসব গ্রামের হাতেগোনা কিছু বাড়িতে মাটির ঘর থাকলেও অধিকাংশ বাড়িতে নির্মিত হয়েছে দালান ঘর ও সেমিপাকা টিনের ঘর। এভাবে ক্রমেই বিলুপ্ত হচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যের মাটির ঘর। জানাগেছে, অতীতে এসব অঞ্চলের অধিবাসীরা পরিবারের সবাই মিলে অল্প কয়েক দিনেই তৈরি করতেন মাটির ঘর।
তারা কোদাল দিয়ে মাটিকে ভালো করে গুড়িয়ে নেয়। পরে পরিমাণ মত পানি মিশিয়ে থকথকে কাঁদা তৈরি করেন। আবার মাটিকে আটকে রাখতে পাটের আশ বা ধানের খর কুচিকুচি করে কেটে সুন্দর ভাবে মিশিয়ে মাটির ঘর নির্মাণ করা হত। সাত থেকে আট ফুট উচ্চতার এ ঘর নির্মাণে তাদের এক-দেড়মাস সময় লাগত। মাটির দেয়ালের উপর বাশ বা কাঠ দিয়ে খাঁচা তৈরি করে তার উপর ছন অথবা ধানের খর দিয়ে ছাউনি দিয়ে ওই ঘরে বসবাস করত। সেই মাটি দিয়েই নির্মান করা হত। কালের পরিক্রমায় বর্তমানে অর্থনৈতিক স্বচ্ছল পরিবারের লোকজন মাটির দেয়াল দিয়ে উপরে টিনের চাল দিতেন। আবার বিত্তবানদের বাড়ীতে থাকতো বিভিন্ন নকশা করা দুই তলা মাটির ঘর। ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘী ইউনিয়ন জোরদিঘী গ্রামে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় প্রায় ৪৫ বছর আগের একটি মাটির ঘর। উত্তর দরজা ঘরে দরজা মারা। বাড়ির বাইরে গাছের নিচে দাড়িয়ে আছে ঘরের মালিক ফালু মিয়া।
তিনি বলেন, এ ঘরে থাকেন বৃদ্ধ মা হাজেরা বেগম। গরমের দিনে এ ঘরে থাকতে ভালো লাগে, গরম লাগেনা, শীতের দিনে শীতও কম লাগে। তাই তার মা ওই ঘরে থাকতে পছন্দ করেন। একারণে ঘরটি ভাঙা হয় না। ঘাটাইল উপজেলার সাগরদিঘী ইউনিয়নের ফুলমালীর চালা গ্রামের আব্দুল জব্বার (৯৬) জানান, প্রায় ৪০ বছর আগে ২০ হাত একটি মাটির ঘর দিয়ে ছিলেন। শাকসবজি চাষ করে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরে আসায় কিছু দিন আগে মাটির ঘর ভেঙে ৩০ হাত দুইটি টিনের ঘর দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে তাদের গ্রামের হাতেগোনা কিছু বাড়িতে মাটির ঘর থাকলেও অধিকাংশ বাড়িতে নির্মিত হয়েছে দালান ঘর ও সেমিপাকা টিনের ঘর। বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যের মাটির ঘর।