ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

৫০০ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে যশোরের কারবালা গোরস্থান

৫০০ বছরের ঐতিহ্য বহন করছে যশোরের কারবালা গোরস্থান

যশোর শহরের সবচেয়ে পুরাতন এবং সর্ববৃহৎ কবরস্থান হলো- কারবালা কবরস্থান। যেটি যশোর শহরের ৫নং ওয়ার্ডে অবস্থিত। শহরের মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের মানুষ ইন্তেকাল করলে শেষ বিদায়ের পর এই কবরস্থানেই দাফন করা হয়। কবরস্থানটি নিয়ে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। প্রতিষ্ঠাকাল এবং কত মানুষ এখানে শায়িত আছেন তার স্পষ্ট তথ্য পাওয়া না গেলেও স্থানীয় মানুষের সাথে কথা বলে এবং সরেজমিন গোরস্থানে গিয়ে যতটুকু জানা গেছে তা হলো, এখানে বাগেরহাটের ইসলাম প্রচারক হযরত খানজাহান আলী (রহ:) সমসাময়িক পীর হযরত নূর বোরহান শাহ (রহ:) এর মাজার শরীফ রয়েছে। যেটি এই কবরস্থানের সবচেয়ে উচু স্থানে এবং বৃহদাকার গম্বুজের নিচে সংরক্ষিত। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী হযরত নূর বোরহান শাহ (রহ:) ও হযরত গরীব শাহ (রহ:) এই দুইজন ছিলেন হযরত খানজাহান আলী (রহ:) এর অন্যতম শিষ্য। অনুমান ১৪০০-১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে খান জাহান আলী (রহ:) যখন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সুন্দরবন অঞ্চলের দিকে যাচ্ছিলেন তখন তিনি তার এই দুই সহচরকে যশোরের মুড়লী কসবা এলাকার দায়িত্ব দিয়ে যান। সেই হিসেবে ধারণা করা হয় পীর নূর বোরহান শাহ্ সেই সময় থেকে যশোরে ইসলাম প্রচার এবং মানবসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার মাজার শরিফকে ঘিরে এই স্থানটি গড়ে ওঠে। তার ইন্তেকাল ও মাজারের পবিত্র স্থানকে কেন্দ্র করেই যশোরের এই এলাকাটি কালক্রমে 'কারবালা' নামে পরিচিতি লাভ করে। সেই থেকে আজও শহরের কারবালা গোরস্থান ও কারবালা মোড় নামে পরিচিতি পায়। সেই হিসেবে ১৫০০ শতক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত হিসেবে করলে এই কবরস্থানটি প্রায় পাঁচ'শ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত বলে ধারণা করা যায়। সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে কারবালা গোরস্থানে লক্ষাধিক মানুষ শায়িত আছেন।

এখানে শায়িত আছেন— যশোরের বিশিষ্ট রাজনীতিক সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম, তার পিতা আব্দুল আজিজ, মাতা নুরজাহান বেগম, খালেদুর রহমান টিটো, অ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেন, সমাজসেবক এএসএম আব্দুল আহাদ, সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবল, গোলাম রফিউদ্দীন চৌধুরী, অ্যাডভোকেট বদরুল আলা, খবির উর রহমান, মতিয়ার রহমানসহ ব্যবসায়ী, প্রশাসনিক, সামরিক ব্যক্তিরা, আলেম-উলামা ও অসংখ্য নারী-পুরুষ।

পীর নূর বোরহান শাহ ওয়াকফ এস্টেট (পীরোত্তর সম্পত্তি) হিসেবে এইসব স্থাপনা পরিচালিত হয়ে আসছে। এস্টেটের আওতাধীন এলাকায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে যেমন, পীর নূর বোনহার শাহ (রহ:) এর মাজার শরীফ ও হুজরাখানা, ঐতিহাসিক বিরাট গোরস্থান, গোরস্থান সংলগ্ন দিঘি, কারবালা জামে মসজিদ, ফ্রি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফোরকানিয়া মাদ্রাসা। স্থানীয় মানুষের কাছে এই স্থানটি ধর্মীয় স্থাপনা এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সমাদৃত। উল্লেখিত স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানগুলি রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য ৩১ সদস্য বিশিষ্ট একটি শক্তিশালী পরিচালনা কমিটি রয়েছে। কবরস্থান কমিটি নির্ধারিত নিয়মের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের দাফন কাজ সহজ রাখার পাশাপাশি স্থায়ী কবরের মাধ্যমে কবরস্থানের সার্বিক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের তহবিল পরিচালনা করছে। পদাধিকার বলে এই কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যশোরের জেলা প্রশাসক (ডিসি)। এছাড়া বর্তমানে কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্বে রয়েছেন যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সেক্রেটারি তানভীরুল ইসলাম সোহান।

স্থায়ী কবরের বিশাল অংকের টাকা ছাড়াও দাফনকাজের সঙ্গে কিছু ব্যবহারিক খরচ জড়িত রয়েছে, যা মৃতের স্বজনদের বহন করতে হয়। কবরস্থানে দাফনকাজ সম্পন্ন করার জন্য স্থানীয় কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিয়মিত কবর খোঁড়ার কাজ করেন। এই কাজ করেই তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রায় চার দশক ধরে কবর খোড়ার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন সিরাজুল ইসলাম ওরফে কংকাল। তিনি জানান, অতিদরিদ্র পরিবারের সন্তান সিরাজ ছোট বেলা থেকেই অভাবের তাড়নায় কবর খোড়ার কাজ করেন। তার শুকনা শারীরিক গঠনের কারণে মানুষ কংকাল নামে ডাকেন। কংকাল নামেই যশোরের মানুষ তাকে চেনে। আফজাল নামে এক বন্ধুর আহ্বানে এই কাজ শুরু করেন। প্রথমে ৫ টাকা থেকে ১০ টাকা দিত। এই পর্যন্ত ৩০-৪০ হাজার মানুষকে কবর দিয়েছেন বলে দাবি করেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি বাশ, বাঁশের চাচ বা বেড়া, কবর খোড়া, মজুরিসহ চার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় খুড়ে দেন। বিখ্যাতসব মানুষের কবর তার হাতেই খোড়া বলে দাবি করেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত