
কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) লাশ যশোরে দাফন করা হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১০টায় সদরের ছাতিয়ানতলা গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাদার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে গভীর রাতে তাজমিনের লাশ গ্রামে পৌঁছালে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রিয়জনের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নিহতের পিতা মাতাসহ স্থানীয়রা।
বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার ধানক্ষেত থেকে জান্নাতুল তাজমিন (১৪) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার আবদুল আলীমের মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারসহ কুমিল্লা শহরে বসবাস করতো তাজমিন। সেখানে স্থানীয় ফরিদা বিদ্যায়াতনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। এই ঘটনায় সুমন নামে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালককে আটক করেছে পুলিশ। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১২ টার দিকে চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়াতে অবস্থিত তাজমিনের গ্রামে বাড়িতে দেখা যায় শোকে স্তব্ধ তার পিতা মাতাসহ নিকট স্বজনরা। স্থানীয় সাংবাদিকরা স্বজনদের ছবি তুলতে গেলে তাজমিনের মা কেয়া খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতে শুরু করেন- 'কি হবে এসব ছবি তুলে! আমার কলিজার পাখিটা যখন চলে গেছে; এখন আর কিছু বলবো না।
আহাজারি করে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমার পাখির সাথে কথা হয় সবশেষ গত বৃহস্পতিবার বিকালে। তখন সে বলে আমি আমার বান্ধবীর সাথে রয়েছি। আমার বান্ধবীর বাড়িতে আছি নিয়ে যাও। তখন আমি তাকে প্রশ্ন করি, তোর সেই বান্ধবীর নাম কি? বাবা মায়ের নাম কি? তখনও সে কিছু বলেনি। তাজমিনের মা ওর বান্ধবীর দিকে অভিযোগের তীর ছোঁড়েন। দাবি করেন, তাকেই ধরলেই এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন হবে। প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়েও। তাজমীনের বাবা আবদুল আলীম কুমিল্লা শহরে একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। একমাত্র সন্তানকে এভাবে হারিয়ে বাকরুদ্ধ তিনি। তিনি বলেন, '৪ অক্টোবর তারিখ বান্ধবীর বাসায় যাবে বলে বাসা থেকে বের হয় মেয়ে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময় তার ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীর বাসায় আছে বলে জানায়। বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক পৌনে দুইটার দিকে সে মেসেজ (খুদে বার্তা) এবং 'লাইভ লোকেশন' (ওই সময় মেয়েটির অবস্থান যেখানে ছিল) পাঠায়। মেসেজে তাকে এসে নিয়ে যেতে বলে। তিনি বলেন, 'তখন আমি ঘুমে ছিলাম। পরে সকালে মেসেজ দেখি। তারপর লাইভ লোকেশনে এসে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে দেখতে পাই। তিনি বলেন, এখন বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে চায় না। আমার মেয়ের সঙ্গে কী হয়েছে, কারা তাকে হত্যা করেছে, পুরো ঘটনা জানতে চাই। জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করার দাবি জানাই।
স্থানীয়রা জানান, তাজমীনের আর কোনো ভাই-বোন নেই। সে খুব মেধাবি ছিল। বিভিন্ন ছুটিতে বাবা মায়ের সাথে গ্রামে বেড়াতে আসতো। জেদি স্বভাবের ছিল। এই হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পুলিশের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর বাসা থেকে বের হওয়ার পর ওই কিশোরী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে যায় সে। বুধবার দুপুরের পর কক্সবাজার থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামে বলে পুলিশ জানায়। পদুয়ার বাজারে নামার পর ওই কিশোরী কীভাবে লালমাইয়ের ওই স্থানে গেল, তা তদন্ত করছে পুলিশ।
এদিকে এ ঘটনায় সুমন নামে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম নগরী থেকে তাকে আটক করা হয়। আটককৃত সুমন স্কুলছাত্রীকে বহনকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মো. মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালিয়ে তাকে চট্টগ্রাম নগরী থেকে আটক করা হয়। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।
গত বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেত থেকে জান্নাতুল তাজমিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি উদ্ধার করা হয়।