
একসময় নিজের ভাগ্য বদলাতে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন আবুল হোসেন। জীবিকার তাগিদে সৌদি আরব ও কুয়েতে কাটিয়েছেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু দেশে ফিরে শুধু নিজের কর্মসংস্থান নিয়েই ভাবেননি, স্বপ্ন দেখেছেন এলাকার অসহায় ও হতদরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী করার। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিনামূল্যে দর্জির কাজ শিখিয়ে প্রায় সাড়ে তিনশ নারীকে কর্মমুখী করেছেন তিনি। তার হাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক নারী এখন নিজেরাই সেলাইয়ের কাজ করে উপার্জন করছেন। এলাকায় তিনি এখন নারী দর্জিদের ওস্তাদ আবুল হোসেন নামে পরিচিত।
আবুল হোসেন ঢাকার দোহার উপজেলার কুসুমহাটি ইউনিয়নের বাস্তা গ্রামের বাসিন্দা। তার পিতার নাম শেখ ওসমান। পেশায় একজন দর্জি হলেও মানুষের কাছে তার পরিচয় এখন শুধু একজন টেইলার্স মাস্টার হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখানো একজন দক্ষ কারিগর। দর্জি পেশায় আবুল হোসেনের হাতেখড়ি ঢাকার বঙ্গবাজারের মোল্লা টেইলার্সে। সেখান থেকেই কাজ শেখা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার কর্মজীবন। ২০০০ সালে পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির আশায় প্রথমে সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখানে প্রায় আড়াই বছর থাকার পর জীবিকার সন্ধানে যান কুয়েতে। প্রবাসজীবনেও টেইলারিং পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। প্রবাসের কর্মজীবন শেষে দেশে ফিরে ২০০৮ সালে কুসুমহাটি ইউনিয়নের বাস্তা বাজারে 'আবুল হোসেন টেইলার্স' নামে একটি দোকান প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের দক্ষতা, পরিশ্রম ও কাজের প্রতি নিষ্ঠার কারণে অল্প সময়েই এলাকায় সুনাম অর্জন করেন। তার কাজের মান ও আন্তরিকতায় দিন দিন বাড়তে থাকে পরিচিতি।
তবে, নিজের পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি সমাজের অসচ্ছল নারীদের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন তিনি। বিশেষ করে যেসব নারী অর্থাভাবে কাজ শিখতে পারছেন না কিংবা পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে জীবন কাটাচ্ছেন, তাদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেন। সেই চিন্তা থেকেই শুরু করেন বিনামূল্যে দর্জির কাজ শেখানোর কার্যক্রম। আবুল হোসেন বলেন, নবাবগঞ্জ উপজেলার বান্দুরা ইউনিয়নের মৌলভীডাঙ্গী গ্রাম থেকে দোহার উপজেলার কুসুমহাটি ইউনিয়নের সুন্দরীপাড়া গ্রাম পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার প্রায় ৩৫০ জন নারীকে তিনি নিজ হাতে দর্জির কাজ শিখিয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০০ জনেরও বেশি নারী ছিলেন হতদরিদ্র পরিবারের সদস্য। তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের পারিশ্রমিক নেননি তিনি। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে আবুল হোসেন বলেন, আমি চাইনি অর্থের অভাবে কোনো নারী কাজ শেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হোক। তাই অনেক নারীকে বিনা পয়সায় দর্জির কাজ শিখিয়েছি। আমার কাছ থেকে কাজ শিখে তারা নিজেরা আয় করবেন, পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন— এটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া। একজন নারী নিজের উপার্জনে যখন সংসারের দায়িত্ব নিতে পারেন, তখন তার চেয়ে আনন্দের বিষয় আর কিছু হতে পারে না। তিনি আরও বলেন, তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রায় ৩৫০ জন নারীর কাছেই বর্তমানে সেলাই মেশিন রয়েছে। তাদের কেউ নিজের অর্থায়নে মেশিন কিনেছেন, আবার কেউ সরকারি সহায়তার মাধ্যমে পেয়েছেন। ফলে প্রশিক্ষণ শেষে অনেকেই বাড়িতে বসে সেলাইয়ের কাজ করছেন এবং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আয় করে পরিবারকে সহযোগিতা করছেন। স্থানীয়দের কাছে আবুল হোসেন এখন একজন জনপ্রিয় ও মানবিক মানুষ হিসেবে পরিচিত। নিজের পেশাকে কাজে লাগিয়ে অসচ্ছল নারীদের কর্মসংস্থানের পথ দেখানোর কারণে তিনি পেয়েছেন আলাদা পরিচিতি ও ভালোবাসা।
সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি নিজের সামর্থ্য ও দক্ষতা দিয়ে অন্তত একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, তাহলে বদলে যেতে পারে অনেক পরিবারের জীবন। আবুল হোসেনের এই উদ্যোগ তারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।