
জীবন যখন পদে পদে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রম কীভাবে সব প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে আলোর পথ দেখায়— তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার আরাফাত খান। সদ্য সমাপ্ত এইচএসসি (বা সমমান) পরীক্ষায় মির্জাগঞ্জ উপজেলার আখতার হোসেন চৌধুরী মেমোরিয়াল কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে উপজেলার ৭টি কলেজের বিজ্ঞান, ব্যবসা শিক্ষা, মানবিক শাখার মোট ৮৫৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জনের গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। বিশেষ করে, তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আখতার হোসেন চৌধুরী মেমোরিয়াল কলেজের পাসের হার ছিল ৪৯.৭০ শতাংশ, যা পুরো উপজেলায় সর্বোচ্চ।
তবে এই দুর্দান্ত সাফল্যের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক মর্মান্তিক ও দীর্ঘ সংগ্রামের উপাখ্যান। আরাফাত খান মির্জাগঞ্জ উপজেলার বাজিতা ৪র্থ খণ্ড গ্রামের মৃত ইসমাইল খানের ছেলে।
আরাফাত যখন দশম শ্রেণির ছাত্র, ঠিক সেই সময়ই আকস্মিক বাবা ইসমাইল খানের অকালমৃত্যু ঘটে। মাথার ওপর থেকে পিতার ছায়া সরে যাওয়ার পর পাঁচ সদস্যের পরিবারটিতে নেমে আসে চরম আর্থিক দুর্দশা ও অনিশ্চয়তা। বড় ভাই মো. আলামিন জন্ম থেকেই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। পরিবারের এই চরম দুর্দিন ও সংকটের মুহূর্তে হাল ধরেন আরাফাতের বড় বোন। উচ্চশিক্ষা না থাকার কারণে ভালো কোনো চাকরি না পেলেও তিনি দমে যাননি। পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে এবং ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা সচল রাখতে তিনি বেছে নেন পোশাক শ্রমিকের কঠিন কাজ। বোনের সেই ঘাম ঝরানো আয় আর কষ্টার্জিত অর্থের ওপর ভর করেই এতদূর এগিয়ে এসেছেন আরাফাত। বর্তমানে বরিশালে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বাড়ি থেকে পাঠানো সামান্য টাকা আর দশম শ্রেণিতে পাওয়া সাধারণ বৃত্তির অর্থ দিয়েই কোনোমতো টেনেটুনে চলছে তাঁর জীবনযাত্রা।
নিজের অদম্য জেদ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মো. আরাফাত খান বলেন, বাবা হারানোর পর আমার বড় বোনের যে আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পোশাক শ্রমিকের কাজ করে তিনি আমাকে যেভাবে আগলে রেখেছেন, আজকের এই সাফল্য কেবল তাঁরই। আমার লক্ষ্য হলো— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা এবং পড়ালেখা শেষ করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া।