
দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারের নিরাপত্তা জোরদার, পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অবাধ বিচরণ নিশ্চিতকরণ এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অপরাধমুক্ত রাখতে মাসজুড়ে অভিযান চালিয়েছে কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ। চোর, ছিনতাইকারি, কিশোর গ্যাংসহ নানা ধরণের অপরাধী ধরতে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে শেখ মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বাধীন এই থানার পুলিশ। থানা সূত্র বলছে, চলতি বছরের পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ৬০ দিনের এক বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত এক হাজার ৮১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সদর থানার একাধিক আভিযানিক দল। একই সময়ে শহর ও শহরতলির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রধান মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠা কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিরুদ্ধে পৃথক ও জোরালো অভিযান চালিয়ে ১৯৬ জন গ্যাং সদস্যকে আটক করে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায় সোপর্দ করা হয়েছে। পুলিশের এই আভিযানিক সফলতায় পর্যটন নগরীজুড়ে সাধারণ নাগরিক ও ভ্রমণ পিপাসুদের মাঝে স্বস্তি ও বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলেই মনে করছে পুলিশ। কক্সবাজার সদর মডেল থানার পরিসংখ্যান মতে, এই পর্যটন নগরীর জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে সড়ক ও গলির অপরাধ, যেমন- চুরি ও ছিনতাই রোধ এবং মাদকের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার ওপর। ৬০ দিনের এই টানা অভিযানে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে পেশাদার চোর ও ছিনতাইকারি চক্রের বিরুদ্ধে। পুলিশ এই সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া এক হাজার ৬০ জনের মধ্যে সর্বাধিক ৩৬০ জন চোর ও ছিনতাইকারিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে, যা মোট গ্রেপ্তারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। অপরদিকে মাদকের বিস্তার রুখতে 'জিরো টলারেন্স' নীতি বাস্তবায়ন করছে পুলিশ। অভিযানে ৮৬ জন চিহ্নিত তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী এবং ৩২৮ জন মাদক সেবনকারীসহ মোট ৪৪০ জন মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়। সূত্র বলছে, পুলিশের এই অভিযানের পরিধি কেবল মাদক বা ছিনতাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং, পুরোনো জট কাটাতে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আদালতের পরোয়ানা তামিল ও অপরাধপ্রবণতা প্রতিরোধেও সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এই অভিযানে দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা আদালতের পরোয়ানাভুক্ত (ওয়ারেন্ট) ১৮৫ জন আসামি, বিভিন্ন থানায় দায়ের করা নিয়মিত মামলার ৩৭ জন আসামিকেও গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা, মোড়ে মোড়ে আড্ডা ও অসামাজিক কার্যকলাপের দায়ে দণ্ডবিধির ২৯০ ধারায় ৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে কিশোর অপরাধ দমনে পুলিশের বিশেষ পদক্ষেপ হিসেবে চট্টগ্রাম রেঞ্জ ও কক্সবাজার সদর মডেল থানার সমন্বিত উদ্যোগে আটক ৪৭৪ জন কিশোরের মধ্যে ২৭৮ জনকে অভিভাবকদের উপস্থিতিতে সতর্কতামূলক মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় এবং অপরাধে সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকায় ১৯৬ জনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের এই নগরীতে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগমন ঘটছে। তাদের জানমালের নিরাপত্তা, নির্ভাবনায় চলাচল এবং শহরের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে সদর থানা পুলিশের এই ধারাবাহিক সাঁড়াশি অভিযান সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখছে। তারা মনে করছেন, শহরজুড়ে পুলিশের দৃশ্যমান টহল, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে চেকপোস্ট স্থাপন এবং আকস্মিক তল্লাশির ফলে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের মূল নেটওয়ার্কই ভেঙে পড়েছে। কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বলেছেন, অপরাধী যে-ই হোক না কেন, পর্যটন নগরী কক্সবাজারের মাটিতে কারো ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, চোর, ছিনতাইকারি, মাদক কারবারি কিংবা উঠতি কিশোর গ্যাং- সব ধরণের অপরাধ চক্রের মূল উৎপাটন না হওয়া পর্যন্ত কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশের এই বিশেষ ও জিরো টলারেন্স অভিযান চলবে। ওসি মোহাম্মদ আলী জানান, তার নেতৃত্বে চলা এই অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া সকল আসামিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। আদালত সকল আসামিকেই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছেন।