প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১২ নভেম্বর, ২০২৫
একটি ছোট শহরের মেয়ে ফেমা, সবসময়ই সবার থেকে আলাদা কিছু করতে চাইত। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য সে একদিন একটি অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিল। শহরের প্রধান চত্বরের ফোয়ারার সামনে নগ্ন হয়ে একটি ছবি তুলল এবং ক্যাপশনে লিখল, ‘আমি আজ সব ধরনের জড়তা, লজ্জা আর সমাজের চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করে সাহসী হলাম।’ ছবিটি দ্রুত ভাইরাল হলো। তার বন্ধুরা এবং ফলোয়াররা তাকে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল, অনেকেই তাকে ‘সাহসী’ এবং ‘বিপ্লবী’ বলল। তবে অধিকাংশ মানুষ এর তীব্র নিন্দা করল। তারা বলল, ‘একটি বেহায়া কাজকে সাহসিকতা বলা যায় না। কোনো গুরুতর কারণ ছাড়া শুধু নিজেদের জাহির করার জন্য এমন কাজ প্রকৃত সাহসিকতার অপমান।’
ফেমা প্রথমদিকে কিছু লোকের প্রশংসা পেয়ে আনন্দিত হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝতে পারল যে তার এই কাজ কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনেনি, বরং শুধু ক্ষণিকের কৌতূহল তৈরি করেছে। তার এই ‘সাহসিকতা’ কোনো গভীর বার্তা বহন করেনি, যা সময়ের সঙ্গে টিকে থাকে। এটি ছিল শুধুই একটি মুহূর্তের নির্বোধ সিদ্ধান্ত, যা তাকে তথাকথিত খ্যাতি এনে দিলেও সত্যিকারের সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়। বরং সে অসম্মানিত হয়েছে।
‘বেহায়াপনা’ শব্দটির উৎপত্তি ‘বেহায়া’ শব্দ থেকে, যা ফার্সি শব্দ ‘বাহানা’ থেকে এসেছে এবং এর অর্থ ‘অজুহাত’ বা ‘দোষ’। ‘বেহায়াপনা’ একটি বিশেষ্য পদ, যা নির্লজ্জ বা লজ্জাহীন আচরণকে বোঝায়। ‘বেহায়া’ শব্দের সাথে ‘পনা’ প্রত্যয় যোগ করে ‘বেহায়াপনা’ শব্দটি গঠিত হয়েছে।
বেহায়াপনা এমন এক ধরনের ব্যবহার, যেখানে একজন ব্যক্তি কোনো ধরনের লজ্জা বোধ না করেই এমন কিছু করে, যা সাধারণত অগ্রহণযোগ্য বা অশালীন বলে বিবেচিত হয়। বেহায়াপনা ব্যক্তির চারিত্রিক অবক্ষয়ের একটি লক্ষণ, যা তাকে সমাজের চোখে হেয়প্রতিপন্ন করে।
ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিবাদ, অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো বা দমনমূলক নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে নগ্নতাকে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েটোতে গৃহহীন নারীরা তাদের বস্তি বুলডোজার থেকে রক্ষা করতে নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। কেনিয়ার রাজনৈতিক বন্দিদের মায়েরা তাদের ছেলেদের মুক্তির দাবিতে নগ্ন হয়ে অনশন করেছিলেন। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে নাইজেরিয়ার কিছু নারী নগ্ন হয়ে মিছিল করেছিলেন।
উপরোক্ত উদাহরণগুলোতে নগ্নতাকে প্রতিবাদের একটি শক্তিশালী উপায় হিসাবে জাহির করেছিল। তারা কারণ হিসেবে দেখিয়েছিল যে, এর পেছনে কোনো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছিল না, ছিল একটি বৃহত্তর সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিবর্তন আনার সংকল্প। নিম্নলিখিত ভাবনা হতে একজন মানুষ অশ্লীল বা নগ্ন হতে পারে- এটি সোশ্যাল মিডিয়া বা অন্য প্ল্যাটফর্মে তাৎক্ষণিক মনোযোগ পাওয়ার একটি চেষ্টা। ওই ব্যক্তির মস্তিষ্কে এমন একটি ধারণা কাজ করে যে, লজ্জা বা জড়তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নগ্ন হওয়াটাই সাহসিকতার চূড়ান্ত রূপ।
একজন মানুষ উলঙ্গ হওয়ার উপযুক্ত কিছু পরিস্থিতি নিচে দেওয়া হলো- অস্ত্রোপচারের আগে এবং কিছু শারীরিক পরীক্ষার সময় পোশাক খুলে ফেলতে হয়। এতে চিকিৎসকেরা রোগীর শারীরিক অবস্থা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসা করতে পারেন। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার জন্য অন্য কোনো পোশাক না থাকা সাপেক্ষে নিরুপায় হয়ে, পোশাক খুলে গোসল করা হয়। সন্তান প্রসবের সময় চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী একজন মাকে উলঙ্গ হতে হয়। এটি প্রসব প্রক্রিয়াকে সহজ করতে এবং চিকিৎসাকর্মীদের পর্যবেক্ষণের সুবিধা দিতে সাহায্য করে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি অন্তরঙ্গতার একটি স্বাভাবিক অংশ।
মানুষ উলঙ্গতাকে একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, যেখানে লজ্জাবোধ এবং শালীনতার মতো বিষয়গুলো জড়িত। কিন্তু পশুপাখির জগতে এসব ধারণার কোনো অস্তিত্ব নেই। তাদের উলঙ্গতা তাদের স্বাভাবিক অবস্থা এবং এটি তাদের সাহসিকতার কারণ বা প্রতিবন্ধক কোনোটিই নয়।
পশুপাখি সাহসী হয় তাদের উলঙ্গ থাকার কারণে নয়, বরং তাদের সহজাত প্রবৃত্তি, বেঁচে থাকার কৌশল এবং কিছু পরিস্থিতিতে তাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্যের কারণে। তাদের সাহস পরিমাপের মাপকাঠি মানুষের মতো নয়।
একজন মানুষ সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন ব্যতীত উলঙ্গ না হওয়ার কারণগুলো বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়, যার মধ্যে রয়েছে সামাজিক, মানসিক, স্বাস্থ্যগত এবং ধর্মীয় কারণ, এর কিছু প্রধান কারণ আলোচনা করা হলো- বেশিরভাগ সমাজে পোশাক পরাকে শালীন এবং গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হয়। পোশাক মানুষের সামাজিক পরিচয়ের একটি অংশ। প্রকাশ্যে পোশাক ছাড়া থাকলে তা নিজের এবং অন্যদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
পোশাকের মূল উদ্দেশ্য হলো- পোশাক মানুষকে বিভিন্ন পরিবেশগত ঝুঁকি, যেমন- ঠান্ডা, গরম, বা সূরে্যর ক্ষতিকর রশ্মি থেকে রক্ষা করতে পারে। এটি পোকামাকড় থেকেও রক্ষা করতে সাহায্য করে। বিভিন্ন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, পোশাক পরাকে শালীনতা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। দেহের সতর (লজ্জাস্থান) ঢাকা, যা মানুষের সম্মান ও শালীনতা রক্ষা করে।
এটি সুস্থ সমাজ গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পোশাক ব্যক্তির রুচি, সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের প্রতিফলন ঘটায়। এটি একই সঙ্গে বাহ্যিক ও আত্মিক সৌন্দর্যের প্রতীক। পোশাক মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা, যা তাদের প্রয়োজন ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি মানুষকে প্রকৃতির প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করে।
তাকওয়ার পোশাক (নৈতিকতা ও বিনয়) হলো সর্বোত্তম পোশাক, যা মানুষকে আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক দিক থেকে উন্নত হতে উৎসাহিত করে। এই নির্দেশনার মাধ্যমে মানুষ সংযম ও মর্যাদা শিখতে পারে। পোশাকের মাধ্যমে সমাজে একটি শৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। এটি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি পালনে সাহায্য করে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে প্রকাশ্যে পোশাক ছাড়া থাকা আইনত দণ্ডনীয় হতে পারে।
সৃষ্টিকর্তা মানুষকে পোশাকের নির্দেশনা দিয়েছেন, কারণ এটি শুধু শরীর ঢাকার এবং সৌন্দর্যের উপকরণই নয়, বরং এটি শালীনতা, নৈতিকতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই নির্দেশনাগুলো মানুষের ব্যক্তিত্ব, সম্মান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে, যা তাদের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। এটি একটি আধ্যাত্মিক বিশ্বাস যে, সৃষ্টিকর্তা সবকিছুই তাঁর অসীম জ্ঞান দিয়ে পরিচালনা করেন, যা মানুষের সীমিত জ্ঞানের বাইরে। মানব জাতি কীভাবে পরিচালিত হবে, উহা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ভালো বলতে পারবেন। তাই মানুষের পক্ষে সবকিছুর সঠিক পরিচালনা বা পরিচালনার নিয়ম সম্পূর্ণরূপে জানা সম্ভব নয়।
সৃষ্টিকর্তা বিভিন্ন প্রাণীকে বিভিন্ন ধরনের লোম বা পশম দিয়েছেন পোশাক হিসেবে। যাকে ইউনিফরমও বলা যায়। প্রাণীদের লোম কাটা হলে দেখতে কুৎসিত মনে হয়। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানবের পোশাক-পরিচ্ছেদ সম্বন্ধের সৃষ্টিকর্তায় সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
যা পৃথিবীর অন্য যেকোনো প্রাণী হতে দৃষ্টিনন্দন। পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মে মানুষকে বেহায়াপনা বা নির্লজ্জ হতে বারন করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে লজ্জা ঈমানের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যখন কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই কেউ শুধু মনোযোগ আকর্ষণ বা চমক সৃষ্টি করতে নগ্নতাকে ব্যবহার করে, তখন তাকে ‘সাহসিকতা’ বলাটা ভুল। এমন কাজকে যদি সাহসিকতা বলা হয়, তাহলে তা সেইসব প্রকৃত সাহসী কাজকে ছোট করে দেয়, যা সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
অধিকাংশ ব্যক্তি নগ্ন হয়ে নিজেকে সাহসী বলে দাবি করে, সেটি সাধারণত সমালোচিত হয়। কারণ, প্রকৃত সাহসিকতা এবং স্রেফ দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য করা কাজের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যা প্রকৃত সাহসিকতার সংজ্ঞা থেকে অনেক দূরে। আমার মনে হয়, পোশাক খুলে ফেলার মতো সাধারণ কাজকে মহিমান্বিত করা এক ধরনের অপরিণত বা কাণ্ডজ্ঞানহীন মানসিকতার পরিচায়ক।
উল্লেখ্য যে, জনসমক্ষে বা সামাজিক ক্ষেত্রে উলঙ্গ হওয়া সাধারণত অগ্রহণযোগ্য এবং এর নিজস্ব নিয়মকানুন রয়েছে, যা সমাজের শৃঙ্খলা ও শালীনতা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আমি মনে করি, দাবি আদায়ের বিকল্প হাজারও পন্থা বিদ্যমান থাকার পরও, অশ্লীলতা বা নগ্নতাকে দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আসুন- নিজে শালীন আচরণ করি এবং অপরকেও অশালীন আচরণ হতে বিরত রাখতে সহায়তা করি।
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রাবন্ধিক ও কথা সাহিত্যিক